ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর সাথে, ভিন্ন এক অভিযানে

আকিমুন রহমান প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২২, ১০:৫৪ পিএম ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর সাথে, ভিন্ন এক অভিযানে

১.

‘হয়তো বা কোনও অদৃশ্য শক্তি আমার অজ্ঞাতে আমার উপর খোদকারি করছে।’

 

এক সেই জন আছে, যার নাম ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু। তার নামের প্রথম অংশটির অর্থ আমাদের অবোধগম্য নয়। স্বর্গ মর্ত্য পাতাল- এই তিন লোকের ঈশ্বর যিনি, তিনিই ত্রিলোকেশ্বর! তবে আমরা পাঠকেরা ওই নামের অতোটা বৃহৎ ব্যাপ্তি নিয়ে ভাবার তাগাদা পাই কি? অতোটা খেয়ালে রাখার, আমাদের কোন দরকার!

তাকে নিয়ে আমাদের আছে, অন্য এক ত্রিলোক! আমাদের এক স্বপ্নলোক আছে। ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু আমাদের স্বপ্নলোকে; দুর্গম দূরের ডাক বাজাতে থাকে,নিরন্তর। আমাদের এক বাস্তবলোক আছে। ওই বাস্তবলোকে, সে, আমাদের ভোলায়-ভাবায়-টলায়-ওড়ায়-ভাসায়! আর আছে এক আমাদের চিত্তলোক। সেইখানে সে আনন্দ-রঙঝুরি-আতশবাজি ছড়াতে থাকে-ছড়াতে থাকে। চিরদিন ধরে ওই আনন্দ-আতশবাজি সে জাগিয়েই যেতে থাকে। আমাদের এই গহন ত্রিলোকেরই নায়ক তো সে। চির ত্রিলোকমুগ্ধকর নায়ক!

আমাদের বহু বহুজনের সমস্তটা আয়ুষ্কাল ধরে, চিরকাল, সে আমাদের সঙ্গী। আমরা আমাদের কিশোর বয়সে তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। তার দুরন্ত বিপদসংকুল অভিযানের গল্পগুলোকে পড়ে উঠতে উঠতে, ক্রমে, আমরা তার ওইসব অভিযানের সামিল হয়ে উঠতে থাকি। বা, সে যখন তার সঙ্গে, আমাদের নিয়ে, আতঙ্ক-জাগানিয়া সব অশৈলী-অলৌকিকের মুখোমুখি হতে থাকে; আমরা বিপুল ভয়ে ও বিস্ময়ে,চমকে ও ভালোলাগায় শিহরিত হতে থাকি। আমাদের সাদামাটা জীবনের সামান্যতাকে তখন আর আমাদের মনে পড়ে না।

তার জীবনে নিত্য, ‘বিচিত্র, বীভৎস, অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ঘটতে থাকে’; আমরা সেইসব দিয়ে মুর্হুমুহু কম্পিত হতে থাকি। কোনোদিন কোনো রোমাঞ্চ অভিযানে বেরিয়ে পড়তে না-পারার অক্ষমতা আর খেদগুলোকে, ভুলে যেতে পারতে থাকি আমরা। তার সঙ্গে সঙ্গেই, আমরা, প্রায় প্রায়ই ঢুকে পড়তে থাকি কল্পবিজ্ঞানের অসম্ভবের দুনিয়ায়। তখন ভরে উঠতে থাকি চাঞ্চল্যে! অবিশ্বাস্যকে সম্ভবপর বাস্তব বলে অনায়াসে মেনে নিতে পেরে, বিপুল আহ্লাদে থইমই হয়ে উঠতে পারতে থাকি আমরা। অগাধ আনন্দ আর অশেষ বিস্ময়- আমাদের কিশোরবেলাকে ঘিরে থাকতে থাকে। ওই সবকিছু, ওই বিস্ময় ও আনন্দ, অফুরান, অফুরান হয়ে থাকে আমাদের জন্য।

কিশোরবেলার পরে, তারপর অনেক অনেকদিন পেরিয়ে যেতে থাকে, আমাদের জীবন থেকে। আমাদের জীবন ও শরীর, কিশোরবেলাকে পেরিয়ে, ক্রমে আরো ঢের অন্য এক বয়সের পথ-ঘাট পেতে থাকে, পেরুনোর জন্য। পেতে থাকে জীবিকার ছুট। পেতে থাকে পা-হড়কে পড়ে যাওয়াকে। কিঞ্চিৎ ডগা-লকমকে সাফল্যের স্বাদকে পেতে থাকে।  পেতে থাকে অঢেল বিফলতা। পেতে থাকে নিরুদ্যম। পেতে থাকে খুব আলোশূন্যতাকে, নিঃসঙ্গতাকে আর নিষ্ফলতাবোধকে। আমরা তখন আমাদের মুগ্ধ হবার সকল শক্তি খুঁইয়ে ফেলতে থাকি। তখন ভুলে যেতে থাকি, আমরা ফুলের গন্ধে দুলে উঠতে জানতাম একদিন। আমরা অশ্রুপাতের শব্দও ঠিক ঠিক শুনে ওঠার সামর্থ্য রাখতাম একদা।

অমন নীরক্ত অর্ধমৃত থেকে থেকে, দিন পার করার দিনও তো আমাদের পেতে থাকতে হয়। তখন,তখনও যদি, ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর মুখোমুখি  বসা যায়, আবার যদি নতুন করে পড়া শুরু করা যায়-পুরোনো ওই আখ্যানগুলো; তখন আবার জীবন- সব স্থবিরতা ফুঁড়ে যেন- পলকেই মাথা উঁচোতে শুরু করে।  মুগ্ধ হতে চাওয়ার আকুলতা, আমাদের মনের কোন গহনে যেনো চ্ছলাৎকার দিয়ে উঠতে থাকে। বহতা মনে হতে থাকে নিজেকে। মনে আবার আশা ফিরে আসতে থাকে। ফিরে আসতে থাকে মুগ্ধ হবার আর চাঞ্চল্য-চমকিত হয়ে ওঠার শক্তিটা। ভালো লাগতে থাকে চরাচর। ভালো লাগতে থাকে, ক্রমে ফুরিয়ে যেতে থাকা আয়ুলগ্ন জীবনটাকে। খুব ভালো লাগতে থাকে, খুব ভালো! এই সামান্য আশপাশটুকু। রোজকার এই সামান্যতাটুকু! কতো যে ভালো লাগতে থাকে! শঙ্কুকে ভালো লাগতে থাকে। আবার নতুন করে তাকেই ভালো লাগতে থাকে। নিজেকেও। শঙ্কু ফিরিয়ে আনে ওই অতো রকমে নতুন করে বেঁচে ওঠার দিনকাল। তার আখ্যানগুলো আবার নতুন করে আমাদের জাগিয়ে তুলতে থাকে। সুখী করে দিতে থাকে। অশেষ সচলতা সঞ্চার করে দিতে থাকে— আমাদের স্থবির-স্তব্ধ অন্তরলোকে।

ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু আমাদের জন্য তার আশ্চর্য পৃথিবীর বৃত্তান্ত নিয়ে প্রথম হাজির হয় ১৩৬৮ বঙ্গাব্দে (ওটা  ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দ)। ওই বছরের আশ্বিন, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসের “সন্দেশ” পত্রিকায় তার কাহিনী বেরোয়, ধারাবাহিকভাবে। প্রথম প্রকাশের সাথে সাথেই প্রোফেসর শঙ্কুর কথা ও কাহিনী চিত্তহর আর মুগ্ধকর বলে গণ্য হতে থাকে। আর, শঙ্কু স্বয়ং পেতে থাকে পাঠকপ্রাণের মুগ্ধতা।

তার জীবনে রোমাঞ্চকর অভিযানের যেমন কোনো শেষ নেই; তেমনি বিপদ-ঝঞ্ঝা-দুর্বিপাকেরও কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। নিজ ল্যাবরেটরীতে থিতু হয়ে থাকার পরিস্থিতি পায় সে সামান্যই; তাকে বরং প্রায়শই বেরিয়ে পড়তে হয় অজানা কোনো দূর ভূভাগের টানে। বা, কোনো না কোনো সেমিনারে যোগ দেয়ার জন্য তাকে অবিরাম ছুটতে হয় নানান দেশে। এবং সর্বত্রই তাকে মুখোমুখি হতে হয়, বিবিধ বিপদের। হয় নিজের আত্মরক্ষার কৌশলগুলো প্রয়োগ করে সে উপস্থিত আপদ-বিপদকে সামাল দেয়, নয়তো দৈব আনুকূল্য এসে তাকে এবং তার সঙ্গীদের রক্ষা করে দেয়। যেখানে তার বসতস্থান,ওই যে উশ্রী নদীর ধারের সেই গিরিডি নামের শহর, সেটি এবং যতো যতো এলাকায় সে যায়; ওই সবটা ভূভাগই হচ্ছে এক সব পেয়েছির দেশ। সেইখানে খাণ্ডুলি পাহাড়, বাড়ির  ছোট বাগানের উত্তর দিকের গোলঞ্চ ফুলের গাছ, ওই গাছের পাশে এক অচিন উল্কা এসে জোনাকীর মতন জ্বলতে থাকে; সেইখানে অসাধ্যও অল্প আয়াসেই সাধিত হয়ে যায়, অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে।

তার নানা কর্মবিষয়ক আখ্যানগুলো যেমন কল্পবিজ্ঞান কাহিনীর বর্ণ-গন্ধ বয়ে আনে, তেমনি আনে দূর অভিযাত্রার বিবরণ। কখনো আনে অশৈলী বিষয়আশয়ের কথা-কাহিনী। ওই সবরকমের আখ্যানগুলোই কেমন একরকমের ‘চমকপ্রদ বিস্ময়’ জাগাতে থাকে! আমাদের মনে ছড়িয়ে দিতে থাকে ‘মজা’; সম্ভাব্যতার সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার ওই গল্পরা আমাদের বলতে থাকে, ‘এই যে অসম্ভব-ওটি মোটেও অবিশ্বাস্য কিছু নয়! এমনটা হয়। এমনটা হতে হয়। হোক এমন! হোক!’ আর ধীরে ধীরে তারা,ওই গল্পেরা, আমাদের ‘পাঠ আনন্দ’ দিয়ে ঘিরে নিতে থাকে। গল্পের সাথে লগ্ন হয়ে থাকার এক অদৃশ্য গভীর ‘টান’ ছড়াতে থাকে! আমরা মোহাবিষ্ট হয়ে পাঠমগ্ন থাকি। যেন থাকতে বাধ্য হই। এল. ফ্র্যাঙ্ক বাউম তাঁর দ্য উইজার্ড অফ ওজ বইয়ের মুখবন্ধে এ জাতীয় লেখাকে অভিহিত করেছেন ‘ নব্য রূপকথা’ বলে! এইখানে অবিশ্বাস্য চমক আছে। হৃদয় উদ্বেল করে দেবার মতো ‘মজা’র সন্নিবেশ ঘটে এইখানে।  সেই ‘মজা’ আর ‘চমক’ই আমাদের দেয়  অভিভূতকর পাঠ-আনন্দ।  নিপাট বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই লেখক এইখানে কল্পজগতকে তুলে ধরেন। ওই কল্প-ভুবনকে তিনি বিস্তৃত বিবরণ সহযোগেই তুলে আনেন। অসম্ভবকে এইখানে লেখক সম্ভবতার মোড়কে মুড়িয়েই হাজির করেন।

এই যে ‘নব্য রূপকথার’ এই ভুবন, যেখানে শঙ্কু বসত করে; এই জগত রাক্ষস-খোক্কস দৈত্য-দানোয় পরিপূর্ণ নয়। এই দুনিয়ায় মানুষেরই বসত আছে। বিচিত্র স্বভাবের মানুষ তারা। এইখানে, খানিকটা ঈর্ষা, খানিকটা তাচ্ছিল্য, খানিকটা ‘অগত্যা-সমীহ বোধ করতে বাধ্য হওয়ার’ আন্তর-চাপ নিয়ে নিয়ে, প্রতিবেশীরাও বাস করে। ধীমান প্রতিবেশীর প্রতিভার কদর দিতে প্রায়শই তাদেরও প্রাণ সরে না। তারপরেও, পড়শীর ভালোমন্দের খয়খোঁজ নিতেও ভুল করে না তারা। এইখানে, মাঝেমধ্যেই অন্য গ্রহের প্রাণীগণেরও উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ব্যাখ্যা-অসাধ্য দৈব বৃত্তান্তও অহরহ ঘটে চলে এইখানে। হরহামেশাই ঘটতেই থাকে।

আমাদের কিশোরবেলার সঙ্গী হিসেবে আরো অনেক অনেক গল্প-গাথাকে পাই আমরা। অনেক অনেক বীরনায়ককেও পাই। তাদের কেউ কেউ তরুণ বয়সী আর সুদর্শন। দেহের শক্তি, ক্ষিপ্রতা, বুদ্ধির ক্ষুরধার নিয়ে তারা অতুল্য। কেউ কেউ কেবলই নব্য তরুণ। স্বপ্ন-উদ্বেল, তরুণ রূপকুমার তারা। আমাদের শঙ্কু- ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু- তাদের মতন তরুণবয়সী কেউ নয়। রূপবান তো সে নয়ই।

গবেষক, বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক এবং অধ্যাপক শঙ্কু গোড়া থেকেই প্রৌঢ় বয়সী। দেখতে অমনোহর। শারীরিকভাবেও অশক্ত একজন সে। থাকার মধ্যে আছে তার মেধা,আছে নিজের গবেষণাগারে নিজ হাতে বানানো কিছু বিস্ময়কর যন্ত্র ও অস্ত্র। আছে তার উদ্ভাবিত কিছু ওষুধ। ওইই সম্বল করে দুর্গম অঞ্চলের কোনো না কোনো অভিযানে বেরিয়ে পড়ে শঙ্কু। নয়তো অতিপ্রাকৃতিক কোনো দুর্বিপাককে সামাল দিতে ছোটে। বাহুবল দিয়ে বৈরী দুশমনকে ঘায়েল করার সামর্থ্য তার নেই। অমিত শক্তিমান বাহুবলী বীর সে নয়। বিপদ আর মুশকিলের পরিস্থিতিগুলো কতকটা সে কৌশলে সামলে নেয়; কতকটা থাকে দৈব সহায়। আর সহায় হয়ে থাকে তার উদ্ভাবিত,অপূর্ব ও অবিশ্বাস্য কর্মসম্পাদনে সমর্থ, অস্ত্র ও যন্ত্রপাতিগুলো।

সমাজ-সংসারের এক সাব্যস্ত মানুষ হিসেবেই আমরা তাঁকে পাই।  তবে সে যাপন করে একাকী এক সাধকের জীবন। গবেষণাপত্র উপস্থাপনের জন্য সে বিজ্ঞান সম্মেলনে যায়, মমি রহস্য উদঘাটনের জন্য সে মিশরে ছোটে, বা মরুভূমিতেও অভিযানে বেরুতে সে পরোয়াহীন। তবে তার ওই প্রৌঢ় দেহকাঠামোর ভেতরে যে সত্তাটি রয়েছে, সেটি সাদাসিধে-আত্মপরিতোষে প্রশান্ত এক কিশোরের। মহা মেধাবী, বেশ বয়স্ক এবং ঢের অসুদর্শন এই নায়ক অন্য কোনোজনের মতো নয়। আমাদের অন্য কিশোর গল্পকাহিনীর কিংবা রূপকথাগুলোর কোনো নায়কই তার মতো নয়। সে একা। সে সকলের চেয়ে ভিন্ন।

এই যে এমন এক দলছুট নায়ক গড়েছেন সত্যজিৎ রায়, যে নায়ক অন্য কারো মতো নয়; অন্যরাও কেউই তার মতো নয়; এমনটি কি কেবলই লেখকের আকস্মিক কোনো খেয়ালখুশির কারণেই ঘটেছে! এক মেধাবী বিজ্ঞানীর অশক্ত বেটেখাটো দেহের ভেতরে, অমনোহর মুখশ্রী ও গড়নের ভেতরে; এই যে এক সরল ও সাদাসিদে কিশোরকে মূর্ত করে তুলেছেন সত্যজিৎ, এটি কি নিছকই নিরীক্ষার কারণেই হয়ে উঠেছে ? নাকি ওটি ঘটেছে  গভীর  কোনো এক প্রভাবের কারণে? ওটি কি কেবলই পাশ্চাত্য প্রভাবজাত? নাকি সত্যজিৎ প্রভাবিত হয়েছিলেন বঙ্গসাহিত্যেরই কোনো শক্তিমান অগ্রজ লেখককে দিয়ে! সেই অগ্রজ লেখকের গড়া কোনো নায়কের কাঠামোটিই কি গ্রহণ করেছিলেন তিনি, তাঁর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুকে গড়ে তোলার জন্য?  আমরা এ-বিষয়টি একটু বিশদভাবে খতিয়ে দেখতে পারি।

 

ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় ও তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ডমরুধর

 

২.

ডমরুধর ও ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু

 

ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর সাথে গভীর সাযুজ্য পাওয়া যায় যার,তার নাম ডমরুধর। ডমরুধর ত্রৈলোক্যনাথ  মুখোপাধ্যায়ের গড়া এক অভিনব চরিত্র। যদিও সত্যজিৎ কোথাও তাঁর ওপর ত্রৈলোক্যনাথের প্রভাবের কথা স্বীকার করেননি। বা, ওই বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখও করেননি কখনো। কিন্তু শঙ্কুকে সৃজনের ক্ষেত্রে সত্যজিৎ যে ত্রৈলোক্যনাথের ডমরুধর চরিত্রটি দিয়ে বেশ ব্যাপকরকমেই প্রভাবিত হয়েছিলেন, সেটি মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এমনকি শঙ্কু বিষয়ক আখ্যানগুলোর বর্ণনা ভঙ্গিটির ওপর ত্রৈলোক্যনাথের ডমরু-চরিত আখ্যানটির  উপস্থাপন রীতিটির প্রভাবও আমাদের অগোচর থাকে না। এছাড়া, সত্যজিতের শঙ্কু বিষয়ক একটি আখ্যানের সাথে ডমরুধরের একটি আখ্যান অংশের  সাদৃশ্যও বেশ স্পষ্টরকমেই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়।

তার আগে বরং ডমরুধর এবং ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর সাথে একটুখানি নিবিড়ভাবে আমরা আমাদের পরিচয় সম্পন্ন করে নিতে পারি।

ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় ( ১৮৪৭ - ১৯১৯)-এর ডমরু-চরিত উপাখ্যানটি প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর পরে, ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে। ডমরু-চরিতের নায়ক ডমরুধর। আখ্যানের গোড়ায় তার সম্পর্কে ত্রৈলোক্যনাথ এমন বক্তব্য পেশ করেন: ‘কলিকাতার দক্ষিণে একখানি গ্রামে ডমরুধরের বাস। প্রথম বয়সে তিনি নিতান্ত দরিদ্র ছিলেন। অনেক কৌশল করিয়া,সাধ্যমতে একটি পয়সাও খরচ না করিয়া তিনি এখন প্রভূত ধনশালী হইয়াছেন। অন্যান্য সম্পত্তির মধ্যে সুন্দরবনের আবাদে তাঁহার এখন বিলক্ষণ লাভ হইয়াছে। ডমরুধর এখন পাকা ইমারতে বাস করেন।’ 

নানাভাবে জোচ্চুরি করে, অন্যের অর্থ আত্মসাৎ করে, ক্রমশ সে সংসারে-সমাজে নিজেকে বিত্তবান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তবে শুধু ওই প্রতিষ্ঠা লাভ করেই তার মন তুষ্ট হয় না; সে আরো মানী আরো মর্যাদাশালী হয়ে ওঠার পথ খুঁজতে থাকে। অচিরেই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মহা আয়োজন করে অতি জাঁকের সঙ্গে যদি ধর্মাচরণের দামামা বাজানো যায়, তবেই অক্ষয় মান-মহিমা- প্রতিপত্তি লাভ সম্ভব। এমত মহাজ্ঞান লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে ডমরুধর নিজেকে ধর্মাচারী প্রতিপন্ন করার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে প্রতিবছর, অতি ঘটা করে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করার কর্মে নিজেকে নিবেদিত করে। সমাজে ধন্য ধন্য রব উঠতে শুরু করে। ডমরুধরের বক্ষও গৌরবে ও অহংকারে স্ফীতকায় থেকে অধিক স্ফীতকায় হতে থাকে।

তার নিজের অতো গরিমা-শ্লাঘার ভার সে আর কতোক্ষণ একাকী বহন করে চলবে! তখন, অন্য দশজনের সঙ্গে নিজ বীর্য আর মহিমার ভার ভাগ করে নেয়ার জন্য ডমরুধর মন অস্থির হয়ে ওঠে। তখন নিজের গৌরবগাথা নিজমুখেই শোনানোর পুণ্যকর্ম শুরু করতে সে দ্বিধা করে কিভাবে! দুর্গাপূজার ‘পঞ্চমীর দিন সন্ধ্যার পর দালানে, যেস্থানে প্রতিমা হইয়াছে, সেই স্থানে,’ জড়ো হওয়া প্রতিবেশী সকলের কাছে নিজ যশ ও সম্পদ ও বিবিধ বিপত্তির ও বিপত্তিমুক্তির ‘গল্পগাছা’ শুরু করে ডমরুধর।

একের পর এক ঘটনার বর্ণনা দিতে থাকে সে। শ্রোতারা কখনো তার গল্প দিয়ে চমকিত হতে থাকে, কখনো গল্পের সীমাহীন আজগুবীত্ব দিয়ে বিরক্ত হতে হতে শেষে ডমরুধরকে শ্লেষ-বিদ্রুপ-উপহাস করতেও আটকায় না তাদের। তবে শ্রোতার ওই উপহাস ও অবিশ্বাস- কোনোকিছুই ডমরুধরকে দমিয়ে দিতে সমর্থ হয় না। ডমরুধর উচ্চকণ্ঠে আত্মগৌরবগাথা প্রচার করে যেতেই থাকে।

ক্রমে ডমরুধর তার জীবনের সকল মহাকর্ম ও বিষম অবিশ্বাস্য ঘটনাবলীর বিস্তারিত বিবরণ পড়শীগণ সমীপে পেশ করে করে আখ্যানের শেষভাগে পৌঁছে যায়। এই উপাখ্যানের কোনো বিশেষ আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি আমরা লক্ষ্য করি না। যেখানে হঠাৎই ডমরুধর নিজ জীবনবৃত্তান্ত বলা বন্ধ করে, উপাখ্যানের সমাপ্তি সেখানেই ঘটে।

ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর সাথে আমাদের পরিচয় ঘটে ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়রি’ নামক আখ্যানের মাধ্যমে। শঙ্কুর সশরীরী উপস্থিতি আমরা কোথাও পাই না, যা পাই তা হচ্ছে ডায়রিতে লিখিত নানা ঘটনার তন্নতন্ন বিবরণ। ওই ঘটনাগুলোর নায়ক ও নিয়ন্ত্রক শঙ্কু নিজে। একদা সে যত যত রোমাঞ্চ অভিযানে বেরিয়ে পড়েছিলো, যত রকমের বিপদের মোকাবেলা করেছিলো, যত প্রকারের বিস্ময় দিয়ে সে বেষ্টিত হয়ে গিয়েছিলো; সেসবের সরল ও অকপট বিবরণই তুলে ধরেছে শঙ্কু, তার ডায়রিতে।

‘ব্যোমযাত্রীর ডায়রি’ উপাখ্যানটি একেবারে শুরুতেই আমাদের জানায়, ‘প্রোফেসর শঙ্কু বছর পনেরো নিরুদ্দেশ। কেউ কেউ বলেন তিনি নাকি কী একটা ভীষণ এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে প্রাণ হারান। আবার এও শুনেছি যে তিনি নাকি; ভারতবর্ষের কোনও অখ্যাত অজ্ঞাত অঞ্চলে গা ঢাকা দিয়ে চুপচাপ নিজের কাজ করে যাচ্ছেন, সময় হলে আত্মপ্রকাশ করবেন। এ-সব সত্যমিথ্যা জানি না,তবে এটা জানতাম যে তিনি বৈজ্ঞানিক ছিলেন।’ সেই পরাক্রান্ত বৈজ্ঞানিকের ডায়রিটির সন্ধান পাওয়া যায় ভারী অদ্ভুত এক এলাকায়, ভারী অদ্ভুত এক পরিস্থিতিতে। যিনি এই ডায়রির খোঁজ পান, তিনি ওটি পান নিতান্ত কাকতালীয়ভাবে। সুন্দরবনে আকস্মিক এক উল্কাপাতের ঘটনাকে সরেজমিনে দেখতে গিয়ে তারক চাটুজ্যে নামক এক ব্যক্তির নজরে আসে ওই ডায়রিটি। সেটা সে কাগজের অফিসে এনে জমা দেবার পরে, পত্রিকাওয়ালারা, ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর ডায়রিটি তাদের কাগজে ছেপে দেয়।

তার ওই লেখাটা কাগজে ছাপা হয় একদিকে, আরেকদিকে আচমকাই সমস্তটা ডায়রিকে ডেঁয়োপিঁপড়েরা খেয়ে শেষ করে দেয়। তবে ওই ডায়রি নষ্ট হবার পরেও যে আমরা প্রোফেসর শঙ্কুর অন্য ঘটনাগুলোর সন্ধান পেতে থাকি, তার মূলে আছে সেই অনামা সাংবাদিকের বদান্যতা। প্রোফেসর শঙ্কুর একটি অভিজ্ঞতার বিবরণ ‘প্রোফেসর শঙ্কু ও হাড়’ নামে  ছেপে দেবার সময় তিনি আমাদের জানান যে, ‘বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু বেশ কয়েক বছর যাবৎ নিখোঁজ। তাঁর একটি ডায়রি কিছুদিন আগে আকস্মিকভাবে আমাদের হাতে আসে। ... ইতিমধ্যে আমি অনেক অনুসন্ধান করে গিরিডিতে গিয়ে তাঁর বাড়ির সন্ধান পাই, এবং তাঁর কাগজপত্র, গবেষণার সরঞ্জাম সব কিছুরই হদিস পাই। কাগজপত্রের মধ্যে আরও একুশখানা ডায়রি পাওয়া গেছে।... প্রত্যেকটিতেই কিছু না কিছু আশ্চর্য অভিজ্ঞতার বিবরণ আছে।’

তারপর থেকে আমরা পেতে থাকি শঙ্কুর নানা অভিজ্ঞতার বিবরণ। সেইখানে তার অভিযানগুলোর বিপদসংকুলতার পরিচয় দিতে থাকে শঙ্কু; দিতে থাকে রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার সরল বর্ণনা। তবে অই বিবরণ লিখতে লিখতে নিজের গদ্যের সাদাসিধে ধরণটা নিয়ে শঙ্কু একরকমের মনস্তাপেও ভোগে। ‘প্রোফেসর শঙ্কু ও গোলক-রহস্য’ শীর্ষক আখ্যানটির বিবরণ দিতে গিয়ে শঙ্কুর মনে হয়: ‘আমার জীবনে যত বিচিত্র, বীভৎস, অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ঘটেছে, অন্য কোনও বৈজ্ঞানিকের জীবনে তেমন ঘটেছে কি? জানি না। এক এক সময় মনে হয় আমি সাহিত্যিক হলে এসব ঘটনা আরও সুন্দর করে গুছিয়ে লিখতে পারতাম। কিন্তু তার পরেই আমার মনে হয় যে অত গুছিয়ে লেখার দরকার কী? আমি তো আর বানানো কাল্পনিক ঘটনা লিখছি না—আমি লিখছি ডায়রি। সোজা কথায় সরলভাবে আমার জীবনে যা ঘটেছে তাই লিখছি। সেখানে অতো ভাষার ব্যবহারের প্রয়োজন আছে কি?’

তারপর থেকে ‘সোজা কথায় সরলভাবে’ একের পর এক নিজ জীবন-অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে চলে শঙ্কু।

 

বাগদাদে শঙ্কু

 

২.১

এবার আমরা ডমরু-চরিত এবং শঙ্কু আখ্যানের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য নির্দেশ করার দিকে মন দিতে পারি।

আখ্যান উপস্থাপনার রীতিটির দিকে যদি তাকাই আমরা, তাহলে দেখবো শঙ্কু-আখ্যান বর্ণনার ক্ষেত্রে সত্যজিৎ ত্রৈলোক্যনাথের কাহিনী বয়ানরীতিটিকেই গভীরভাবে অনুসরণ করেছেন। ডমরু-চরিত গ্রন্থের কাহিনী উপস্থাপক ডমরুধর স্বয়ং। সে নিজমুখে নিজের কীর্তিকাহিনী তার প্রতিবেশীদের শুনিয়ে চলে। যতক্ষণ সে তার আত্মশ্লাঘাবিষয়ক কথাকাহিনী চালিয়ে যেতে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত উপাখ্যানটিও চলন্ত থাকে। ডমরু-চরিত উপাখ্যানটি চালু রীতিমাফিক শুরুও হয় না, ক্রমে ক্রমে এর কাহিনী বা চরিত্রদের বিকাশের ব্যাপারটিও এখানে ঘটে না। ডমরুধরের একের পর এক অভিজ্ঞতার বিবরণমাত্র রচিত হয়েছে এখানে।

আমাদের ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর আখ্যানগুলোও উত্তম পুরুষে রচিত। যদিও সশরীরে উপস্থিত থেকে, স্বজন-প্রতিবেশীবেষ্টিত হয়ে নিজমুখে নিজ কীর্তিকাহিনীর ব্যাখ্যান করে না শঙ্কু; কিন্তু ডায়রিতে নিজের মনের কথা  অনর্গল বলে চলে সে। শঙ্কু-আখ্যানগুলোরও  প্রথামাফিক সুনির্দিষ্ট কোনো আরম্ভ নেই। নেই কোনো প্রথাসিদ্ধ সমাপ্তিও। এরাও কেবলই ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর বিবিধ অভিজ্ঞতার বিবরণ মাত্র। যতদিন শঙ্কু তার অভিজ্ঞতাকে শব্দে গেথে চলতে থাকে, ততদিন পর্যন্ত কাহিনী বহতা থাকতে থাকে। এখানেও পাত্রসকলে ডমরু-চরিতের পাত্রদের মতোই বরাবর একইরকম স্থির ও পরিবর্তনহীন। এখানেও শুধু অভিজ্ঞতার পর অভিজ্ঞতা বর্ণিত হতে থাকে। আর তারা শ্রোতার মনে চমকের পরে চমক জাগিয়ে তুলতে থাকে।

ডমরু-চরিত আমাদের জানায় যে, ডমরুধরের জীবনে তার সুন্দরবনের তালুকের অশেষ ভূমিকা আছে। ওই আবাদ থেকে সে শুধু খাজনাপাতিই আদায় করে না, নিজের যেকোনো সংকটের কালেও সে ওই সুন্দরবনের নিরালায় গিয়েই নিজেকে শ্রুশ্রুষা দেয় আর নিজেকে সুস্থির করে তোলে। এক সন্ন্যাসীর ষড়যন্ত্রের কারণে সে যখন নিজের স্থূল দেহটিকে খোয়াতে বাধ্য হয়, তখন নিজ সূক্ষ্ম শরীরটাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য সে ওই সুন্দরবনকেই উপযুক্ত জায়গা বলে বুঝে উঠতে পারে। ‘সূক্ষ্ম শরীর অতি ক্ষুদ্র, হাওয়া দিয়া গঠিত, সূক্ষ শরীর কেহ দেখিতে পায় না।... আমি ভাবিলাম,“দূর কর! বনে গিয়া বসিয়া থাকি। সুন্দরবনে মনুষ্যের অধিক বাস নাই, যমদূতদিগের সেদিকে বড় যাতায়াত নাই, সেই সুন্দরবনে গিয়া বসিয়া থাকি। বায়ুবেগে সুন্দরবনের দিকে চলিলাম।... এইস্থানে বসিয়া মনের বেদনায় আমি কাঁদিতে লাগিলাম।’

আপদের কালে সুন্দরবনে ঠাঁই নিয়ে যেমন প্রাণ ঠাণ্ডা করে ডমরুধর, তেমনি সুন্দরবনেই সে পায় নিজ আপৎমুক্তির নিদান। কাঠুরেদের পাতা ফাঁদে-পড়ে এক রয়েল বেঙ্গল টাইগার নিজেকে বাঁচাবার জন্য, তার শরীরের খোলস খসিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়। ডমরুধর জানায়; ‘প্রাণের দায়ে ঘোরতর বলে বাঘ শেষকালে যেমন এক হ্যাঁচকা টান মারিল, আর চামড়া হইতে তাহার আস্ত শরীরটা বাহির হইয়া পড়িল।... মাংস বাঘ রুদ্ধশ্বাসে বনে পলায়ন করিল।... বাঘশূন্য ব্যাঘ্রচর্ম্ম সেই স্থানে পড়িয়া রহিল।’ তখন ডমরুধরের উপস্থিতবুদ্ধি তাকে নিজেকে রক্ষার পথ দেখায়: ‘আমার কি মতি হইল, গরম গরম সেই বাঘ-ছালের ভিতর আমি প্রবেশ করিলাম। ব্যাঘ্র-চর্ম্মের ভিতর আমার সূক্ষ্ম শরীর প্রবিষ্ট হইবামাত্র ছালটা সজীব হইল।’ এমন বিবিধরকমে সুন্দরবন তালুক ডমরুধরকে সর্বাংশে আগলে রাখে।

অন্যদিকে আমরা শঙ্কু-উপাখ্যানের একেবারে গোড়াতেই দেখি, এখানে, সুন্দরবন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। নিখোঁজ প্রোফেসর শঙ্করু ডায়রিটি, আকস্মিকভাবেই, পত্রিকার সাংবাদিকটির হাতে এসে পৌঁছোয়। সে জানায়: “প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর ডায়রিটা আমি পাই তারক চাটুজ্যের কাছ থেকে। একদিন দুপুরের দিকে আপিসে বসে পুজো সংখ্যার জন্য একটা লেখার প্রুফ দেখছি, এমন সময় তারক বাবু এসে একটা লাল খাতা আমার সামনে ফেলে দিয়ে বললেন, ‘পড়ে দেখো। গোল্ড মাইন।’... বললেন,‘সুন্দরবনের সে ব্যাপারটা মনে আছে তো?’... একটু বিরক্ত হয়েই বললাম,‘কোন ব্যাপারটার কথা বলছেন?’ ‘উল্কাপাত! ব্যাপার তো একটাই।’... বললাম,‘তার সঙ্গে এই খাতাটার কী সম্পর্ক?’ তারকবাবু বললেন,‘আমি গেসলাম এই মওকায় যদি কিছু বাঘছাল জোটে।... কিন্তু সে গুড়ে বালি।... ছিল কিছু গোসাপের ছাল। তাই নিয়ে এলুম। আর এই খাতাটা।...  পাথরটা পড়ায় একটা গর্ত হয়েছিলো জান তো?... এটা ছিলো তার ঠিক মধ্যিখানে।... লাল-লাল কী একটা মাটির ভেতর থেকে উঁকি মারছে দেখে টেনে তুললাম। তারপর খুলতেই শঙ্কুর নাম দেখে পকেটস্থ করলাম।’

তারপর নানা সময়ে নানাভাবে, সুন্দরবনের সঙ্গে, শঙ্কুর কোনো না কোনোরকম যোগাযোগ ঘটতেই থাকে। অন্য সকল ভূভাগের দিকে যাত্রা করার সময়ও শঙ্কুকে উড়ে যেতে হয় সুন্দরবনেরই ওপর দিয়ে। পেতে হতে থাকে বিবিধ বিস্ময়কর সুন্দরবনীয় অভিজ্ঞতা।

‘স্বপ্নদ্বীপ’ আখ্যানে শঙ্কুর জন্য সুন্দরবন আসে এমন রূপ ধরে: ‘সুন্দরবনের উপর দিয়ে যখন যাচ্ছি,তখন সব ক’টা শকুনি হঠাৎ একসঙ্গে নীচের দিকে গোঁৎ খেল। আমিও সঙ্গে সঙ্গে প্লেনটাকে নীচে নামাতে শুরু করলাম। ... শেষে এমন হাইটে পৌঁছোলাম যেখানে গাছের পাতার মধ্যে পাখির বাসায় ডিম পর্যন্ত দেখা যায়।... প্রায় পঞ্চাশ ফুটের মধ্যে নেমে বুঝলাম কীসের লোভে শকুনিরা এখানে নেমেছে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। একটি বিশাল রয়েল বেঙ্গল টাইগার পাশেই বোধ হয় কোনও গ্রাম থেকে একটা আস্ত গোরুকে ঘায়েল করে টেনে নিয়ে এসেছে নিরিবিলিতে তাকে ভক্ষণ করবে বলে।... বাঘটাও দেখলাম আকাশের দিকে মাথা উঁচিয়ে একদৃষ্টে আমাদের প্লেনটাকে দেখতে লাগল।... সামনে একশো হাতের মধ্যে বাঘ। এবার প্লেনের শব্দ ছাপিয়ে তার গর্জন শুনতে পেলাম।’ ডমরুধরের  জীবনের মতো শঙ্কুর জীবনকেও জড়িয়ে থাকে সুন্দরবন। গভীরভাবেই থাকে।

 

২.২

আখ্যান উপস্থাপনরীতির ক্ষেত্রে সত্যজিৎ যতটা ত্রৈলোক্যনাথকে দিয়ে প্রভাবিত হয়েছেন; তার চেয়ে অনেক বেশী প্রভাবিত হয়েছেন তিনি, তার নায়কের দেহকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে। ডমরুধর বিকট কুদর্শন। তার অন্তরলোক যেমন অসাধুতায় ভরা, তার বহিরঙ্গ যেন ওই আন্তর-অসুন্দরতার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্যই হয়ে উঠেছে বিভীষিকা উদ্রেককর অসুন্দর।

ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুও অবিকল ডমরুধরেরই মতো বাহ্যিক রূপশূন্য আর অতি অমনোহর। যেন শঙ্কুর আন্তর-প্রতিভা-দ্যুতিকে তীব্ররকমে প্রকাশ করে দেবার জন্যই সত্যজিৎ তার নায়কের বাহ্য অবয়বকে দিয়েছেন মলিনতা আর অনাকর্ষণীয়তা। তবে এই দুই নায়কের দেহ-কাঠামোর বিবরণ পাঠের পর, আমাদের কাছে এ-তথ্য অস্পষ্ট থাকে না যে, ডমরুধরের দেহকাঠামোটি ধার করেই সত্যজিৎ, তাঁর মহামেধাবী নায়কটিকে আমাদের সামনে হাজির করে দিয়েছেন।

বিত্তবান ডমরুধরের ভাগ্যে কিছুমাত্র দৈহিক সৌন্দর্য জোটেনি। নিজের অনাকর্ষণীয় দৈহিক অবস্থাটি বিষয়ে সে সম্যক অবহিত। তবে ওটি নিয়ে তার কোনো মনঃপীড়া নেই। অন্য সকলের কাছে নিজ কুদর্শনতাকে  ডমরুধর নিজেমুখেই, অবলীলায়ই, বলে যেতে পারে। কিছুমাত্র অস্বস্তি পায় না। ডমরুধর নিজেকে এভাবে দেখে: 

‘অবশেষে আমি ভাবিয়া দেখিলাম যে, আমার বয়স পঁয়ষট্টি বৎসর, তাহার পর আমাকে দেখিয়া কেহ বলে না যে, ইনি সাক্ষাৎ কন্দর্প পুরুষ। নিজের কথা নিজে বলিতে ক্ষতি নাই; এই দেখ, আমার দেহের বর্ণটি ঠিক যেন দময়ন্তীর পোড়া শউল মাছ। দাঁত একটিও নাই। মাথার মাঝখানে টাক, তাহার চারিদিকে চুল,তাহাতে একগাছিও কাঁচা চুল নাই, মুখে ঠোঁটের দুই পাশে সাদা সাদা কি হইয়াছে।’

শঙ্কুও, ডমরুধরেরই মতো, অমনই সৌন্দযর্ ভাগ্যবঞ্চিত। তার দেহগড়নের যে বর্ণনা আমাদের কাছে পৌঁছে দেন সত্যজিৎ, ওই বর্ণনা ডমরুধরের দেহকাঠামো ও সৌন্দর্যপরিস্থিতিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

“ব্যোমযাত্রীর ডায়রি”তে নিজেকে শঙ্কু এভাবে দেখেছে: ‘আজ দিনের শুরুতেই একটা বিশ্রী কাণ্ড ঘটে গেল। রোজকার মতো আজও নদীর ধারে মর্নিং ওয়াক সেরে ফিরেছি। শোবার ঘরে ঢুকতেই একটা বিদঘুটে চেহারার লোকের সামনে পড়তে হল। চমকে গিয়ে চিৎকার করেই বুঝতে পারলাম যে ওটা আসলে আয়না, এবং লোকটা আর কেউ নয়-আমারই ছায়া। এ ক’বছরে আমারই চেহারার ওই রকম হয়েছে।’

অন্যত্র, “স্বপ্নদ্বীপ” আখ্যানে, শঙ্কু এভাবে  নিজের বর্ণনা দেয়: ‘তেরো বছর বয়সে আমার মাথায় প্রথম পাকা চুল দেখা দেয়। সতেরো বছরে টাক পড়তে শুরু করে। একুশ পড়তে না পড়তে আমার মাথা-জোড়া টাক-কেবল কানের দুপাশে, ঘাড়ের কাছটায় আর ব্রহ্মতালুর জায়গায় সামান্য কয়েকগাছা পাকা চুল। অর্থাৎ আজও আমার যা চেহারা, পঁয়তাল্লিশ বছর আগেও ছিলো ঠিক তাই।’

“প্রোফেসর শঙ্কু ও ভূতে” প্ল্যানচেটে মৃত মিত্রদের সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে শঙ্কু। ওই সময়ে নিজের অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ ঈশ্বর বটুকেশ্বর শঙ্কুকে নিজের অজান্তেই মর্ত্যে নামিয়ে আনে সে। দূর থেকে প্রপিতামহের দেহ-কাঠামো দেখে শঙ্কুর এমন অনুভূতি হয়: ‘যে বসে আছে সে বৃদ্ধ। তার মাথায় টাক, কানের দুপাশে সামান্য পাকা চুল, গোঁফ ও দাড়ি অপরিচ্ছন্নভাবে ছাঁটা। যদিও সে আমার দিকে পাশ করে বসে আছে এবং আমার দিকে ফিরেও চাইছে না, তাও বেশ বুঝতে পারলাম যে তার চেহারার সঙ্গে আমার চেহারার আশ্চর্য মিল।’

ডমরুধরের মতোই, শঙ্কুও, নিজের সৌন্দর্যপরিস্থিতিটাকে একেবারে নির্মোহভাবে, নির্বিকার নির্লিপ্তি নিয়েই গ্রহণ করতে পেরেছে। এমনকি নিজের অল্প উচ্চতার বিষয়টি নিয়ে নিজের সঙ্গে নিজে পরিহাসও করতে পারে শঙ্কু। ‘নকুড়বাবু ও এল ডোরাডো’ আখ্যানে নিজের উচ্চতা নিয়ে শঙ্কুর মন এমন পরিহাসে উদ্বেল হয়ে ওঠে: ‘মিনিট তিনেক পরে যিনি আমার ঘরে প্রবেশ করলেন, ঠিক তেমন একজন মানুষকে আর কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। ভাগ্যে তৃতীয় ব্যক্তি কেউ নেই ঘরে; থাকলে সব দিক দিয়েই প্রমাণ সাইজের প্রায় দেড়া এই মানুষটির পাশে আমার মতো একজন মিনি মানুষকে দেখে তিনি কখনওই হাসি সংবরণ করতে পারতেন না।’

নিজের নানা অভিজ্ঞতার বিবরণ লিখে ওঠার সাথে সাথে আত্মভাবনার বিবরণ টুকে রাখতেও কখনো ভোলে না শঙ্কু। “প্রোফেসর শঙ্কু ও ম্যাকাও” গল্পে নিজেকে নিয়ে শঙ্কুর মনে এমন ধন্দ জাগে: ‘আমার চেহারা দেখে আমাকে বোধহয় নিরীহ গোবেচারা বলেই মনে হয়।’ আবার ‘প্রোফেসর শঙ্কু ও চী-চিং’ আখ্যানে শঙ্কুর মনে এমন আশঙ্কা আসে: ‘বুঝলাম! আমার চেহারা দেখে চী-চিং আমাকেও একজন নিরীহ গোবেচারা বলেই ধরে নিয়েছে।’

তবে শুধু বিদেশী বিভাষীদের দিয়েই নানাভাবে অস্বস্তিগ্রস্ত হয় না শঙ্কু; তাকে অস্বস্তিপীড়িত করার জন্য বরাবরই তৈরী হয়ে থাকে একজন। সেইজন শঙ্কুর অতি-নিকট প্রতিবেশী অবিনাশ বাবু। ডমরুধরের ভুবনেও ঠিক অমনই একজন চির নিন্দুক অথচ আগাগোড়া পাশে-থাকা প্রতিবেশীর উপস্থিতি আমরা লক্ষ্য করি।

 

২.৩

ডমরুধরের তাবৎ গৌরবকথাকে অবিশ্বাস ও তাচ্ছিল্য দিয়ে দিয়ে যে বাতিল করে দিতে চায়, সে লম্বোদর। লম্বোদর ডমরুধরের একেবারে আঙ্গিনা-লাগোয়া পড়শী। সে প্রায় সর্বক্ষণই ডমরুধরের আশেপাশে ঘোরে-ফেরে। ডমরুধরের সকল কথায় সন্দেহও পোষণ করে সে সবচেয়ে বেশী। ডমরুর কথাকে পরিহাসে-বিদ্রুপে বিদ্ধ করে করে উল্লাস পায় সে। টিপ্পনী কাটে। কিন্তু ডমরুধরের সঙ্গ পরিহার করা তার পক্ষে একান্ত অসম্ভব। ওটি সে কিছুতেই পারে না। অন্যদিকে লম্বোদরের অনুপস্থিতিও ডমরুধরের পক্ষে মেনে নেয়া কঠিন হয়ে থাকে।

ক্ষণে ক্ষণে লম্বোদর ডমরুধরকে তিরষ্কার করার জন্যই তৈরি হয়ে থাকে। ডমরুর সকল আত্মকথাতেই সে মিথ্যে গালগপ্প ও ভেজালের উপস্থিতি দেখতে পায়। তবে ডমরুধরও ওইসব আক্রমণকে শক্ত থাবড়ায় ফিরিয়ে দিতে জানে। ফলে লম্বোদরের সাথে তার নিত্যকার বাহাসকে ডমরুধর ভালোই জমাতে পারে। সেসবের কিছু উদাহরণ আমরা উদ্ধৃত করতে পারি:

এক. ‘লম্বোদর বলিলেন, “এত আজগুবি গল্প তুমি কোথায় পাও বল দেখি।’ ডমরুধর বলিলেন, “এতক্ষণ হাঁ করিয়া এক মনে এক ধ্যানে গল্পটি শুনিতেছিলে। যেই হইয়া গেল, তাই এখন বলিতেছ যে, আজগুবি গল্প। কলির ধর্ম্ম বটে।”

দুই. লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন, “কাহাকে সে বেগুন বেচিতেছিল? কুমীরের পেটের ভিতর সে খরিদ্দার পাইল কোথা?”

বিরক্ত হইয়া ডমরুধর বলিলেন, “তোমার এক কথা! কাহাকে সে বেগুন বেচিতেছিল, সে খোঁজ করিবার আমার সময় ছিল না।”

ডমরুধরের বাক্যবক্তব্যকে যেমন পরিহাসে বিদ্ধ করতে থাকে লম্বোদর, তেমনি ডমরুর দেহসৌষ্ঠবের ন্যূনতাকেও উপহাস করতে কুন্ঠিত হয় না সে। ডমরুধরের আত্মগরিমায় এইভাবে উপহাসের শীতল জল ছিটিয়ে ফেলে সে: “দেখ লম্বোদর, ঐ যে ময়ূরের উপর যিনি বসিয়া আছেন, উনি আর কেহ নহেন, উনি আমি স্বয়ং।... লম্বোদর বলিলেন, “হাঁ,কার্ত্তিকের মত তোমার রূপ বটে।” ডমরুধর বলিলেন, “ঠাট্টা কর, আর যাই কর। গণৎকার যাহা বলিয়াছে,তাহা ঠিক।”... লম্বোদর  বলিলেন, “আবার বুঝি একটা আজগুবি গল্প হইবে?” ডমরুধর রাগিয়া বলিলেন, “তোমার যদি শুনিতে ইচ্ছা না থাকে,তাহা হইলে কানে আঙ্গুল দিয়া থাক।”

ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুও এমনই এক প্রতিবেশীর উপদ্রব সহ্য করে চলে। এইখানে তার নাম অবিনাশ বাবু। সে প্রোফেসর শঙ্কুর প্রতিভার যথার্থ কদর করতে অসমর্থ, কিন্তু সময়ে অসময়ে শঙ্কুকে দেখতে আসা থেকেও নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারে না কখনো। প্রোফেসর শঙ্কুও অবিনাশ বাবুর উপস্থিতিতে ঘোর বিরক্তি বোধ করতে থাকে, আবার তার সান্নিধ্যও উপেক্ষা করতে পারে না।

নিজের প্রায় সকল অভিজ্ঞতার বিবরণ রচনাকালে যেমন শঙ্কু তার নিজেকে নিয়ে নানা ভাবনার বিষয়টিও বাক্যে বাক্যে মূর্ত করে তুলতে থাকে, তেমনি অবিনাশ বাবু সম্পর্কেও নিজের মনের কথা অবিকল তুলে ধরতে কুণ্ঠা করে না শঙ্কু।

এই প্রতিবেশীকে নিয়ে প্রোফেসর শঙ্কুর মনে, ক্ষণে ক্ষণে এমন বোধের ওঠাপড়া চলতে থাকে: 

এক.‘কাজের সময়ে অবিনাশ বাবু এসে পড়লে রীতিমতো ব্যাঘাত হয়। অযথা আজেবাজে প্রশ্ন করেন, টিটকিরি দেন, আর আমার সূক্ষ্ম গভীর তাৎপর্যপূর্ণ কাজগুলো পণ্ড করার নানান ছেলেমানুষি চেষ্টা করেন। এতে যে উনি কী আনন্দ পান তা জানি না। তবে ভদ্রলোক আমার প্রায় পঁচিশ বছরের প্রতিবেশী, তাই সবই সহ্য করি।’

দুই. ‘গ্রীষ্মকাল, বৈশাখ মাস। আমি বিকেলে আমার বৈঠকখানায় বসে কফি খাচ্ছি, এমন সময়ে অবিনাশ বাবু এসে হাজির। আমার গবেষণা নিয়ে অবিনাশ বাবুর ঠাট্টাগুলো আমার মোটেই ধাতে সয় না, কিন্তু আজ তাঁর মুখ বন্ধ করার মতো অস্ত্র আমার হাতে ছিল।’

তিন. ‘... এমন সময়ে অবিনাশ বাবু এসে হাজির। বললেন, ‘কী মশাই, আপনি তো চাঁদপুর না মঙ্গলপুর কোথায় চললেন। আমার টাকাটার কী হল?’ এই হল অবিনাশ বাবুর রসিকতার নমুনা। বিজ্ঞানের কথা উঠলেই ঠাট্টা আর ভাঁড়ামো। রকেটটা যখন প্রথম তৈরি করছি তখন একদিন এসে বললেন, ‘আপনার ওই হাউইটা এই কালীপুজোর দিনে ছাড়ুন না! ছেলেরা বেশ আমোদ পাবে!’

পরিহাস-ব্যঙ্গের সাথে সাথে শঙ্কুকে কঠিন আঘাত করতেও ছাড়ে না অবিনাশ বাবু। নিপাট ভদ্রলোক শঙ্কু আবার চুপ মুখে সেইসব শ্লেষ-আঘাত সহ্যও করে নেয়। ‘আমাকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে বিদায় নেবার আগে ভদ্রলোক বেশ শ্লেষের সঙ্গেই বললেন, ‘পুঁথিগত বিদ্যার দৌড় তো দেখলাম মশাই। বিশ বছর ধরে অ্যাসিড ম্যাসিড ঘেঁটে হাতটাত পুড়িয়ে তো বিস্তর নাজেহাল হলেন। এইসব ছেলেখেলা বন্ধ করে আমার সঙ্গে আলুর চাষে নেমে পড়ুন।’  শুধু শঙ্কুর গবেষণা নিয়ে যথেচ্ছ পরিহাস-বিদ্রুপ করেই ক্ষান্ত হয় না সে, শঙ্কুর গড়ন-পিটনও পায় অবিনাশ বাবুর তুমুল উপহাস। “অবিনাশ বাবু এবার হো হো করে হেসে উঠলেন। ‘এ আবার কী ভিমরতি ধরল আপনার! অস্বীকার করছেন কেন? ওরকম করলে যে লোকে আরও বেশি সন্দেহ করবে। আপনার পাঁচ ফুট দু ইঞ্চি হাইট, ওই টাক- ওই দাড়ি- গিরিডি শহরে এ আর কার আছে বলুন’!” যেন লম্বোদরই অবিনাশ বাবুর মুখে এইখানে কথা বলে ওঠে। অবিকল একই সুরে।

 

২.৪

ডমরুধরের একটি আখ্যানের সঙ্গে শঙ্কুর একটি উপাখ্যানেরও বিপুল সাদৃশ্য লক্ষ্য করি আমরা। এই সাদৃশ্য সত্যজিতের ওপর ত্রৈলোক্যনাথের প্রভাবের গভীরতাকেই আমাদের সামনে স্পষ্ট করে তোলে।  ডমরু-চরিত আখ্যানের শুরুতেই ডমরুধর সর্বসমক্ষে ব্যক্ত করে যে, এক গাছে-ঝোলা সাধুর কারণে একদা তার জীবন অতীব বিপদাপন্ন হয়ে পড়েছিলো। ডমরুধর জানায়: “গ্রামের প্রান্তভাগে বিন্দী গোয়ালিনীর যে ভিটা আছে, সে জমি আমার। কিছুদিন পূর্ব্বে বিন্দী মরিয়া গিয়াছিল। তাহার চালাঘরখানি তখনও ছিল। দুইজন চেলা সঙ্গে করিয়া কোথা হইতে এক সাধু আসিয়া সেই চালাঘরে আশ্রয় লইল।... সাধুর দুইটি চক্ষু অন্ধ। চেলারা বলিল যে, তাহার বয়স পাঁচশত তিপ্পান্ন বৎসর। চালাঘরের সম্মুখে যে আমগাছ আছে, চেলারা তাহার ডালে সাধুর দুই পা বাঁধিয়া দিত। প্রতিদিন প্রাতঃকালে একঘন্টা কাল নীচের দিকে মুখ করিয়া সাধু ঝুলিয়া থাকিত। চারিদিকে হৈ হৈ পড়িয়া গেল।... সেই ছোঁড়ারা আসিয়া সাধুর কেহ পা টিপিতে লাগিল, কেহ বা বাতাস করিতে লাগিল, সকলেই পাদোদক খাইতে লাগিল।”

ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর  “প্রোফেসর শঙ্কু ও হাড়” আখ্যানেও আমরা অমনই এক সাধুকে পেয়ে যাই। সে সাধুও একইরকম  উর্ধ্বপদ হেট মুণ্ডু হয়ে বৃক্ষাসীন থাকে। শঙ্কুর কাছে তার খোঁজ নিয়ে আসে অবিনাশবাবু। সত্যজিৎ ওই বৃত্তান্তের এমন বিবরণ রচনা করেন: ‘ বৈঠকখানায় ফিরে এসে সোফায় বসতেই অবিনাশবাবু বললেন,‘... যেটা বলার জন্য আসা। শ্মশানটা পেরিয়ে একটা শিমুল গাছ আছে দেখেছেন তো? সেইটেয় এক সাধু এসে আস্তানা গেড়েছেন।’... গাছের ডাল ধরে ঝুলে যোগসাধনা করেন ইনি। পা দিয়ে গাছের ডাল আঁকড়ে মাথা নিচু করে ঝুলে থাকেন, হাতদুটোও ঝুলে থাকে। এইটেই নাকি এঁর অভ্যাস। ... সাধুটির সঞ্জীবনীমন্ত্র জানা আছে।... জন্তুজানোয়ারের কঙ্কাল এনে দিলে মন্ত্রের জোরে সেগুলোকে রক্ত-মাংস দিয়ে আবার জ্যান্ত করে ফেলেন।’

সরেজমিনে অবিনাশবাবুর কথার সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে শঙ্কু অনুধাবন করে: ‘সাধুবাবার চেহারা যে ঠিক এমনটি হবে তা আমি অনুমান করিনি। গায়ের রং মিশকালো, লম্বায় প্রায় ছ’ফুট, চুলদাড়ি কাঁচা এবং ঘন, বয়স বোঝার কোনও উপায় নেই। শিমুল গাছের ডালে পা দিয়ে যেভাবে ঝুলে আছেন সাধুবাবা, সাধারণ মানুষের পক্ষে সেভাবে বেশিক্ষণ থাকলে মাথায় রক্ত উঠে মৃত্যু অনিবার্য। অথচ এই লোকটির চেহারায় অসোয়াস্তির কোনও লক্ষণ নেই। বরং ঠোঁটের কোণে একটু মৃদু হাসির ভাব রয়েছে বলেই মনে হল।’ এই সাধুরই আছে অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার ক্ষমতা।

ডমরুধরের গাছে-ঝোলা সাধুটির অসাধ্য সাধন করার ক্ষমতা সীমাহীন। দেহ থেকে আত্মাকে পৃথক করে দেবার মন্ত্রশক্তি আয়ত্তে আছে তার। সেই মন্ত্রগুণে, সাধুটি, ডমরুধরের দেহ থেকে তার আত্মাকে তাড়িয়ে দেওয়ায় বন্দোবস্ত সম্পন্ন করে। অকস্মাৎ আক্রান্ত ও চরম বিপন্ন ডমরুধর বোধ করে: ‘ঘর সবুজ বর্ণের ধূমে পরিপূর্ণ হইল। আমার নিদ্রার আবেশ হইল।... আমার হাত পা অবশ অসাড় হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু আমার জ্ঞান ছিল। হঠাৎ আমার মাথা হইতে “আমি” বাহির হইয়া পড়িলাম। আমার শরীরটি তৎক্ষণাৎ মাটির উপর শুইয়া পড়িল।... অনেকক্ষণ কিছুই দেখিতে পাইলাম না। অনেকক্ষণ পরে চাহিয়া দেখি যে, “আমি” বসিয়া আছি। অর্থাৎ আমার সেই বড় শরীর আসনে বসিয়া আছে, আর সন্ন্যাসীর শরীর মাটীতে পড়িয়া আছে। কি হইয়াছে, তখন বুঝিতে পারিলাম। বুঝিলাম যে, সবুজ গুঁড়ার ধূম দিয়া আমার স্থূল অন্নময় কোষ অধিকার করিয়াছে। আমার শরীর হইতে  প্রাণময় কোষ, মনোময় কোষ, আর সকল কোষ বাহির করিয়া, সন্ন্যাসী আপনার সূক্ষ্ম শরীর দ্বারা আমার শরীর বটে, কিন্তু ঐ যে আসনে বসিয়া আছে,ও আমি নই, ও সন্ন্যাসী।’

প্রোফেসর শঙ্কুর গাছে-ঝোলা সাধুরও আছে অমনই অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা। সে মৃত পশুর হাড়ই শুধু জোড়া লাগিয়ে দেয় না, সেই পশুকে সম্পূর্ণ জ্যান্ত করে তোলারও মন্ত্রসিদ্ধ সে। শঙ্কু সাধুবাবার সেই তেলেসমাতি কারবারের প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। ‘এবার দেখতে পেলাম, সাধুটির মাথার ঠিক নীচেই বেড়ালের সাইজের কোনও জানোয়ারের হাড় স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সাধু তাঁর দু’হাত একত্র করে দশটি আঙুল সেই হাড়ের দিকে তাগ করে রেখেছেন। হঠাৎ এক বিরাট হুংকার দিয়ে সাধুবাবা দুলতে আরম্ভ করলেন- তাঁর দৃষ্টি হাড়ের স্তূপের উপর নিবদ্ধ।... মিনিটখানেক দোলার পর সাধুবাবা স্থির হলেন।... এমন সময় দেখি সাধুবাবা তাঁর বা হাতটা উঁচিয়ে অস্তগামী সূর্যের দিকে নির্দেশ করছেন। আর ডান হাত বাঁই বাঁই করে ইলেকট্রিক পাখার মতো ঘোরাতে আরম্ভ করেছেন। তারপর আরম্ভ হল মুখ দিয়ে এক অদ্ভুত শব্দ।... এত তীক্ষ্ণ উঁচু স্বর আর এমন দ্রুত বিড়বিড়োনি যে মানুষের পক্ষে সম্ভব তা জানতাম না।

আমি বৈজ্ঞানিক। এরপর চোখের সামনে যা ঘটল তার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কি না জানি না। হয়তো আছে।... কিন্তু যা দেখলাম তা এতই জলজ্যান্ত পরিষ্কার যে সেটা অবিশ্বাস করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। যা ছিল আলগা কতগুলো হাড় তা এক নিমেষে প্রথমে জায়গায় জায়গায় জোড়া লেগে গেল-... এবং সবশেষে প্রাণ, আর প্রাণ আসার সঙ্গে সঙ্গেই হাড়ের জায়গায় একটা ফুটফুটে সাদা খরগোশ মিটমিট করে এদিক ওদিক চেয়ে কান দুটোকে বার কয়েক নাড়া দিয়ে এক লাফে লোকজনের পায়ের ফাঁক দিয়ে দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। গভীর চিন্তা ও বিস্ময় নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।’

দুই সাধুই অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন, আর দুজনেই দুষ্টমতি এবং হিংস্র। অন্যের অহিতসাধন করে নিজ স্বার্থ সিদ্ধি করতে বদ্ধপরিকর তারা দুজনেই। আক্রান্ত ডমরুধরের বুদ্ধির ক্ষিপ্রতা ও কূটকৌশল তাকে সাধুর খপ্পর থেকে উদ্ধারের পথ পাইয়ে দেয়। আর, প্রতিহিংসাপরায়ন সাধুর হিংস্র আক্রমণ থেকে বিপন্ন শঙ্কু রক্ষা পায় নেহাতই ভাগ্যের দয়ায়।

এসব সাদৃশ্য থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়, সত্যজিৎ ত্রৈলোক্যনাথকে দিয়ে ভালোরকমই প্রভাবিত হয়েছিলেন। তবে বিস্ময়কর এই যে, ওই প্রভাবের কথা উল্লেখের প্রয়োজন তিনি কখনো বোধ করেননি।

সত্যজিৎ তাঁর ওই অতুল্য নায়কটিকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ত্রৈলোক্যনাথকে দিয়ে প্রভাবিত হয়েছেন ঠিক, তবে ওই প্রভাবকে অতিক্রম করে তিনি গড়ে তুলেছেন অভিনব এক রূপকল্প। গড়েছেন এমনই এক নায়ক, যে চির আলাভোলা, আর অমিত প্রতিভাশালী। ডমরুধরের শরীরকাঠামোর ছাঁচে ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুকে গড়া হয়েছে ঠিক, কিন্তু প্রবণতা ও স্বভাবের দিক থেকে ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু আর ডমরুধরের মধ্যে কোনো মিল নেই।

ত্রৈলোক্যনাথের লক্ষ্য ছিলো তাঁর সমাজের বাঙালীজন কতোটা বিকারশূন্য পামর; সেটি প্রতিপন্ন করা। ওটি তিনি নিরাসক্ত আঙুলেই সম্পন্ন করতে সমর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে সত্যজিতের লক্ষ্য হচ্ছে, এক বাস্তব-অপটু প্রতিভার সর্ব মহত্ত্বকে নির্দেশ করা। দৈহিক অসুন্দরতা সত্ত্বেও আন্তর-লাবণ্যে এবং মেধার প্রাখর্যে সেই প্রতিভাবানটি কতোটা দীপ্র ও দীপ্তিশালী, ওটি প্রতিপন্ন করা। সেটি সত্যজিৎ সাফল্যের সাথেই করে উঠেছেন।

ডমরুধরের জীবনে সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, হিতাহিতের বিবেচনাবোধ ইত্যাদির কোনো মূল্য নেই। ডমরুধর  সংসারথিতু এক গৃহস্থ এবং আদ্যোপান্ত সে অসাধু, জোচ্চোর, ভণ্ড। আত্মস্বার্থসিদ্ধির জন্য সদাতৎপর এক শঠ। যে-কোনো প্রকারে পরের ধন আত্মস্থ ও অধিগত করাই তার জীবনের লক্ষ্য। নিজের দুষ্কর্ম নিয়ে তার অস্তিত্বের ভেতরে এবং বাইরে- কোথাও কোনোরকমের মনস্তাপ নেই। কোনো গ্লানি নেই; কোনোপ্রকার অপরাধবোধেও দংশিত হয় না সে কদাপি। সে জানে, তার সমাজে পুণ্যাত্মা বলে গণ্য হবার জন্য পূণ্য সাধনার দরকার নেই। দরকার, আড়ম্বরের সঙ্গে ধর্মানুষ্ঠান পালন। ওটি করার মধ্য দিয়েই, সহজেই লোকের কাছে ধার্মিক বলে বাহবা পাওয়া সম্ভব। ডমরুধর এই কথা বিশ্বাস করে এবং নিজের জীবনব্যাপী অমনটা অনুশীলন করে চলে সে।  বঙ্গসমাজের অন্য তস্কর বিত্তবান সামাজিকের মতোই ডমরুধরও, আত্মশ্লাঘা সহযোগে সমাজে ও সংসারে বিরাজ করে চলে।

এমত পামর ডমরুধরের দেহকাঠামোটাকে শুধু নিজ নায়কের জন্য গ্রহণ করেছেন সত্যজিৎ। আর ওই কাঠামোটির ভেতরে জাগিয়ে তুলেছেন বন্ধু বৎসল, লোক কল্যাণকামী এবং সাধনামগ্ন একজনকে, যে একই সঙ্গে ধ্যানে থিতু হতে জানে। আর জানে, রহস্য অনুসন্ধানে জন্য অজানার পথে নামতে।

 

৩.

‘দুর্গম গিরিপথ, বেয়াড়া শীত, আর তার সঙ্গে আরও পাঁচ রকম বিপদ-আপদের কথা কল্পনা করে ... এই বয়সেও আমার রোমাঞ্চ হচ্ছে!’

 

শঙ্কুর বয়স্ক দেহে বাস করে সহজ  এক নব্য-তরুণ। বিপুলরকমে আত্মভোলা একজন সে। নিজ সাধনার এলাকায় নানা কারণে বারংবারই বিপন্ন হয়ে ওঠে তার জীবন। কখনো কখনো বুদ্ধির জোরে, আর তার মিত্রদের সহায়তায়, এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ভাগ্যের দয়ায়; শঙ্কু সকল বিপত্তিকে পেরিয়ে আসতে সমর্থ হয়। গবেষণাগারে কাজ নিয়ে মেতে থাকাতেই সে পরম পরিতুষ্ট বোধ করে। আবার, যখন-তখনই তাকে ডেকে ওঠে দূর কোনো অজানা নিরুদ্দেশের ভূভাগ। তখন শঙ্কুর পক্ষে নিজ গবেষণাগারে থিতু থাকা আর কর্মলগ্ন থাকাটা হয়ে ওঠে অসম্ভব। তাকে অজানার ডাকে সাড়া দিয়ে দিতে হয়। তাকে বেরিয়ে পড়তে হয়।

কখনো নতুন কোনো গবেষণার তাড়া তাকে নিরুদ্দেশের দিকে তাড়িয়ে নিতে থাকে। কখনো শুধুই স্বপ্নে পাওয়া কোনো ডাক, তাকে তাড়িত করতে থাকে। সে দূর অচিনের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। যাত্রা করে অচিন দেশের উদ্দেশ্যে।

এই যে তার এমন দূরের দিকে, অজানার দিকে বেরিয়ে পড়া; তাঁর এই ঝোঁক আর এই প্রবণতা—তাকে—আমাদের পুরাণ ও রূপকথার নায়কদের গোত্রভুক্ত করে তোলে। ওই নায়কেরা সকলেই দেহে নবীন, অন্তরে তো বটেই। আমাদের শঙ্কু দেহে বয়স্ক, কিন্তু তার অন্তরে আছে তরুণের অধিক এক তরুণ। শান্তচিত্তের সে, কিন্তু অ্যাডভেঞ্চারের জন্য তার রক্তে বয়ে চলে অগাধ চাঞ্চল্য। আর, সে যখন অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে পড়ে, তখন তার ভেতরে ঝনাৎকার দিয়ে উঠতে থাকে মুগ্ধতা। ভীতি-অনিশ্চয়তার ঝড়ঝঞ্ঝা তখন তাকে কিছুমাত্র স্পর্শ করতে পারে না। সে নিবিড়রকমে তখন পারিপার্শ্বকে পাঠ করতে থাকে আর অভিভূত হতে থাকে। এই কারণেই সে এমন অতুল্য।

আমরা দেখতে পাই, আমাদের রূপকথা আর পুরাণের নায়ককে প্রায় প্রায়ই বেরিয়ে পড়তে হয় এক ‘অসম্ভবের খোঁজে’। এই ভুবনের প্রধান যে চরিত্র থাকে, তাকে যাত্রা করতে হয় দুস্তর দুর্গম, না-ফুরন্ত, কঠিন আর বৈরী এক পথ ধরে। কেনো যাত্রা করতে হয় এমন? তাকে যাত্রা করতে হয় দুই কারণে। হয় কোনো দুর্লভ ধনকে অধিগত করার দায় থাকে তার; নয়তো তাকে বেরুতে হয় কোনো মহা নিদানের খোঁজে।

 

এনকিদুর মৃত্যুতে গিলগামেশের শোক। ছবি: হাসান নোদিয়ান

 

এ সভ্যতার আদি মহাকাব্য গিলগামেশের কথা এখানে মনে করতে পারি আমরা। সেখানে নায়ক মহাবীর নায়ক গিলগামেশকে বেরিয়ে পড়তে হয়েছিলো ‘অমরত্বের খোঁজে’। নিজ বাহুবলের ওপর অগাধ ভরসা আর সিংহাসনের ওম নিয়ে গিলগামেশের জীবন তখন সুখে-গৌরবে-পরিতোষে ভরভরা; অমনদিনে অকস্মাৎ মৃত্যু এসে হামলে পড়ে গিলগামেশের পৃথিবীতে। তার প্রিয় বান্ধব এবং আপৎকালের চিরসহায় এনকিদুর মৃত্যু ঘটে। এনকিদুর ওই আকস্মিক অকাল প্রয়াণ, গিলগামেশের আত্মবিশ্বাসকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সে বোধ করে, তার জন্যও অমন হিম ও অন্ধকার মোড়ানো পরিণামই অপেক্ষা করে আছে। চির ভরসারজনকে খোয়ানোর যন্ত্রণা সহ্য করার সাথে সাথে গিলগামেশ তখন, নিজ মৃত্যুভয়েও তছনছ হতে থাকে। ত্রস্ত গিলগামেশ শেষে বেরিয়ে পড়ে মরণ জয় করে ওঠার নিদানের খোঁজে। পথে যেতে যেতে এমন বিলাপে আর আহাজারিতে ক্ষয়ে যেতে থাকে গিলগামেশ:

“Despair is in my heart and my face is the face of one who has made a long journey, it was burned with heat and with cold. Why should I not wander over the pastures in search of the wind? ¸ friend, my younger brother, he who hunted the wild ass of the wilderness and the panther of the plains, my friend, my younger brother who sei“ed and killed the Bull of Heaven and overthrwe Humbaba in the cedar forest, my friend who was very dear to me and who endure dangers beside me, Enkidu my brother, whom I loved, the end of mortality has overtaken him. I wept for him seven days and nights till the worm fastened on him. Because of my brother I am afraid of death, because of my brother I stray through the wilderness and cannot rest. …Hwo can I be silent, hwo can I rest, when Enkidu whom I love is dust, and I too shall die and be laid in the earth forever.  …Give me, oh, give me directions. I will cross the ocean if it is possible; if it is not I will wander still farther in the wilderness…”

বা, উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ‘ঘ্যাঁঘাসুর’ গল্পটিকে আমরা এখানে স্মরণ করতে পারি। ওই উপকথার নায়ক মাণিক লালকে বেরিয়ে পড়তে হয়েছিলো ঘ্যাঁঘাসুরের লেজের পালকের সন্ধানে। বা, ‘কিরণমালা’ রূপকথায় কিরণমালা যেমন বেরিয়ে পড়েছিলো দুই অগ্রজকে উদ্ধার করে, মায়া পাহাড় থেকে সোনার ফল ফলিয়ে যাওয়া হীরার বৃক্ষটাকে আনার জন্য। মায়া পাহাড় থেকে ওইসব অমূল্য ধন আনার পণ নিয়ে, প্রথমে বেরিয়ে পড়ে জ্যেষ্ঠভ্রাতা অরুণ। যাবার আগে ছোটো দুই ভাইবোন— বরুণ আর কিরণমালার কাছে রেখে যায় এক যাদুর তরবারী। আর বলে যায় যে, ‘যদি দেখ, যে, তরোয়ালে মরিচা ধরিয়াছে, তো জানিও আমি আর বাঁচিয়া নাই।’ দিন মাস পেরোতে পেরোতে একদিন দেখা যায়, তরবারিতে মরচে ধরেছে। বরুণ তখন বেরিয়ে পড়ে অজানার খোঁজে। কিরণমালা বরুণের জন্য অপেক্ষা করতে করতে একসময় বুঝে উঠতে পারে যে, তার বরুণ দাদারও ফিরে আসার আর কোনো আশা নেই।

তখন ‘কিরণমালা কাঁদিল না, কাটিল না, চক্ষের জল মুছিল না; ... চক্ষের পলক ফেলিয়া কিরণমালা মায়া পাহাড়ের উদ্দেশে বাহির হইল।’ যেতে যেতে পথে পথে কতো প্রলোভন কতো পিছু ডাক ছুটে আসতে থাকে কিরণমালার দিকে, কিরণমালা কোনো কিছুর দিকে ফিরেও তাকায় না। তার পেছনে কতো ভয়-জাগানো গর্জন জাগতে থাকে, কিরণমালা ভুলেও ঘাড় ফেরায় না। কারণ সে জানে, এই যাত্রাপথে, এগিয়ে যাওয়ার কালে, কখনো পিছু ফিরে তাকাতে নেই। শুধু একরোখা পায়ে নিজেকে টেনে নিয়ে যেতে হবে গন্তব্যের দিকে। তবেই সিদ্ধি লাভ সম্ভব। নইলে নয়। ওই যে অমন পিছু তাকানোর কারণেই তার দুই দাদা পাথর হয়ে গেছে। তাই ‘কিরণমালা  কোনদিকে ফিরিয়া চাহিল না, পায়ের নীচে কত পাথর টলে গেল, কত পাথর গলে গেল, চোক্ষের পাতা নামাইয়া তরোয়াল শক্ত করিয়া ধরিয়া, সোঁ সোঁ করিয়া কিরণমালা একেবারে সোনার ফল হীরার গাছের গোড়ায় গিয়া পৌঁছিল।’

বা, হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের ‘দ্য স্নো কুইন’ গল্পের যে প্রধান চরিত্র, তার নাম কায়। কায় নামের ছেলেটি আচমকা নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে, তার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে বালিকা গের্ডা। গের্ডা কায়কে নিজের প্রাণতম প্রিয় বন্ধু বলে মানে। পথ পাড়ি দিতে থাকে গের্ডা, আর তার সাথে সাথে সে পেরোতে থাকে ঋতুর পরে ঋতু, অচিন ভূভাগের পর আরো অচিন  ভূভাগ।

এমন  অসম্ভবের খোঁজে শঙ্কুও বেরিয়ে পড়েছে বারংবার। কখনো কখনো ওই ‘অসম্ভবের ডাকটা’ হঠাৎ যেন অবিশ্বাস্য কোনো একটা ঘটনার মধ্য দিয়ে বেজে উঠতে থাকে। “ব্যোমযাত্রীর ডায়রি”তে শঙ্কু সেটা এভাবে বোধ করতে থাকে: ‘আর একটা কথা আমার প্রায়ই মনে হয়। সেটা হচ্ছে, বাইরের কোনও জগতের প্রতি আমার যেন একটা টান আছে, এই টানটা লিখে বোঝানো শক্ত। মাধ্যাকর্ষণের ঠিক উলটো কোনও শক্তি যদি কল্পনা করা যায়, তাহলে এটার একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে। মনে হয় যেন পৃথিবীর প্রভাব ছাড়িয়ে যদি কিছুদূর উপরে উঠতে পারি, তা হলেই এই টানটা আপনা থেকেই আমাকে অন্য কোনও গ্রহে টহে নিয়ে গিয়ে ফেলবে। এ টানটা যে চিরকাল ছিল তা নয়। একটা বিশেষ দিন থেকে এটা আমি অনুভব করে আসছি।’

কখনো কখনো স্বপ্নের ভেতরে ওই সুদূর অজানার ডাকটাকে শুনতে পায় শঙ্কু। “স্বপ্নদ্বীপ” আখ্যানে কেবলই তার ঘুমের ভেতরে স্বপ্ন হয়ে বেজে বেজে উঠেছে এক ডাক! ‘গত তিনরাত পর পর আবার সেই রঙিন জায়গার স্বপ্ন দেখেছি। প্রতিবারই জায়গাটা সম্পর্কে কিছু কিছু নতুন তথ্য পেরেছি। যেমন, সেদিন দেখলাম গাছপালা ভেদ করে পিছন দিকে সমুদ্রের জল দেখা যাচ্ছে। একটা নামও স্বপ্নের মধ্যে কে যেন বারবার কানের কাছে বলতে লাগল... ‘ফ্লোরোনা... ফ্লোরোনা... ফ্লোরোনা... ’

তারপরেও একটু দ্বিধা এবং কুণ্ঠায় জড়োমড়ো হয়ে ওঠে শঙ্কু! ‘অদ্ভুত ব্যাপার। কাল রাত্রেও সেই একই জায়গার স্বপ্ন। ... পাঁচদিন পর পর একই স্বপ্ন দেখার ফলে জায়গাটাতে যাবার ইচ্ছে প্রবল হয়ে উঠেছে। একটা সম্ভবত-কাল্পনিক জায়গার প্রতি এ ধরনের আকর্ষণ মোটেই বৈজ্ঞানিকের লক্ষণ নয়, সেটা বেশ বুঝতে পারছি। কিন্তু কী আর করি? ডায়রিতে তো মনের আসল ভাবটা প্রকাশ করতে হয়।’ একদিকে ঘুমের ভেতরে আসা স্বপ্নের ডাক নিয়ে এমন দ্বিধা-দোলাচল জাগতে থাকে শঙ্কুর মনে, অন্য দিকে তার মন মনে মনে জপতে থাকে: ‘এমন জায়গা কি সত্যিই আছে? স্বপ্ন সত্যি না হওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু তাও বলব— থাকলে বড় ভাল হত। কিন্তু কোথায়? কোন গ্রহে আছে এমন জায়গা?’

শেষে সে পথে নামেই! সেই অজানার খোঁজে পা সে বাড়ায়ই। যাত্রাপথের পুরোটাই থাকে বিপদ আকীর্ণ। পথ দুর্গম তো বটেই। বিপদগ্রস্ত শঙ্কু তখন ক্ষণে ক্ষণে এমনও বোধ করে যে, ‘আজ থেকে আমি অজ্ঞান অসহায়। ভবিষ্যৎ অজ্ঞেয়, অন্ধকার।’ তবু কিছুই তাকে দমাতে পারে না। সে এগোতেই থাকে। ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু না থামতে জানে, না দমতে জানে। সে এগোয়।

এক্ষেত্রে, আমাদের রূপকথার নায়কদের অভিযাত্রার শেষটার সাথে শঙ্কুর অভিযাত্রার শেষটার মিল নেই। রূপকথার প্রত্যেকে দুস্তর পথ পেরোয়। তারা প্রত্যেকে কঠিন বিপন্নতাকে মোকাবেলা করে। তারপর তারা প্রত্যেকেই কাম্য দুর্লভ বস্তুকে অধিগত করেই। শেষ পর্যন্ত তারা কেউই বিফল হয় না। সকলেই তারা সফল এবং জয়ের গৌরবে প্রীত-প্রসন্ন।

শঙ্কুর অভিযানগুলো, শেষে, অমন কোনো প্রাপ্তিকে এনে দেয় না। ওই যে দুর্গমতাকে, ওই যে অমন অমন সব অচিন মুল্লুককে পেরোনো হলো, সেই যাত্রার অভিজ্ঞতাটুকুই এখানে থাকে পরম সম্বল হয়ে। এইক্ষেত্রে ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ার আখ্যানের সাথে গিলগামেশের ‘নিদান সন্ধানী’ আখ্যানের রয়েছে গভীর মিল। গিলগামেশ অমরতার সন্ধানে বেরোয় ঠিকই; অসহ দুর্ভোগ আর যন্ত্রণা সহ্য করে ঠিকই, কিন্তু শেষপর্যন্ত সে নিদানের খোঁজ পায় না।

 

এমনকি হৃততারুণ্য ফিরে পাবার যে দিব্যগুল্মটি উপহার হিসেবে পায় গিলগামেশ, ওটিও এক হিংস্র এক সরীসৃপ এসে ছিনতাই করে নেয়। দীর্ঘ দুস্তর নিষ্ফল যাত্রার পর, ভগ্নমনোরথ গিলগামেশকে শেষে শূন্য হাতেই নিজ রাজ্যে ফিরে আসতে হয়। বিফলতার ক্রন্দনদীর্ণ গিলগামেশকে আমরা এভাবে উপস্থাপিত হতে দেখি: “Then Gilgamesh sat down and wept, the tears ran down his face, and he took the hand of Urshanabi; ÒO Urshanabi, was it for this that I toiled with my hands, is it for this I have wrung out my heartÕs blood? For myself I have gained nothing; not I, but the beast of the earth has joy of it now. Already the stream has carried it twenty leagues back to the channels where I found it. Let us leave the boat on the bank and go.”

ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর ক্ষেত্রেও অবিকল অমনটিই ঘটেছে। সেও বারংবার অসম্ভবের তল্লাশে বেরিয়ে পড়েছে। মুখোমুখি হয়েছে বিপুল সঙ্কট ও বিপদের। তখন হয়তো সে দুর্লভ নানাকিছুকে দেখেও উঠেছে, স্পর্শও করেছে, গন্ধও নিয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো নিদানকে বাক্সে পুরে নিয়ে আসার পরিস্থিতি হয়নি তার। বা, বলা যায়, দুর্গম ওইসব অভিযাত্রার রোমাঞ্চটুকুই তার অর্জন হয়ে রয়ে গেছে। কেননা, বরাবর ওই বিপদ-উপদ্রবের রোমাঞ্চকেই পেতে চেয়েছে শঙ্কু। ওই-ই হয়ে উঠেছে তার পরম কাম্য, তাকেই অঢেল রকমে পেয়েছে শঙ্কু।

ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর সাথে যেতে যেতে আমাদের মনে হতে থাকে; কেবলই মনে হতে থাকে, অমন করে যে যাত্রা করতে পেরেছি আমরা, সে এক মহাভাগ্যের ব্যাপার!

 

ব্যবহৃত প্রবন্ধ

১. সুপ্রিয় সেন: ‘ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু’ , সত্যজিৎ: জীবন আর শিল্প। প্রতিভাস, কলকাতা। প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ১৯৯৬।

২. চণ্ডী মুখোপাধ্যায়: ‘ শঙ্কু-কাহিনীর মধ্যে কেবল ৮টি’, সত্যজিৎ: জীবন আর শিল্প। প্রতিভাস, কলকাতা। প্রথম  প্রকাশ: জানুয়ারি ১৯৯৬।

৩. প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত: ‘জুল ভের্ন,হার্বাট ওয়েলস এবং ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু’, সত্যজিৎ রায় ও সায়েন্স ফিকশন। পত্রলেখা, কলকাতা। প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২০।

 

ব্যবহৃত গ্রন্থপঞ্জি

১. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়: বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের ধারা, মডার্ন বুক এজেন্সী,কলকাতা। ষষ্ঠ পুনর্মুদ্রণ: ১৩৮০ বঙ্গাব্দ।

২. দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার: “ ঠাকুরমার ঝুলি”, দক্ষিণারঞ্জন রচনাসমগ্র (প্রথম খণ্ড)। মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি:, কলকাতা।  প্রথম প্রকাশ:  বৈশাখ ১৩৮৬।

৩. দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার: “দাদামশা’য়ের থলে”, দক্ষিণারঞ্জন রচনাসমগ্র (দ্বিতীয় খণ্ড)। মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি:, কলকাতা।  প্রথম প্রকাশ:  বৈশাখ ১৩৮৮।

৪. জসীম উদদীন: ডালিম কুমার। পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা। প্রথম প্রকাশ: সেপ্টেম্বর  ১৯৬০।

৫. উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী: উপেন্দ্রকিশোর রচনাবলী, এশিয়া পাবলিশিং কোম্পানি, কলকাতা। প্রথম প্রকাশ: আগস্ট ১৯৭৩।

৬. উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী: গুপী গাইন বাঘা বাইন, সেতারা মুদ্রণ,ঢাকা। প্রকাশকাল: ??

৭. সুকুমার রায়: ‘পাগলা দাশু’, সমগ্র শিশুসাহিত্য সুকুমার রায়, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা.লি., কলকাতা। চতুর্দশ মুদ্রণ: আশ্বিন ১৪০৮। 

৮.  ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়: ত্রৈলোক্যনাথ রচনাবলী, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা। প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০০১।

৯. সত্যজিৎ রায়: গল্প ১০১। আনন্দ পাবলিশাস প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা। প্রথম প্রকাশ:  মে ২০০১।

১০. সত্যজিৎ রায়: শঙ্কু সমগ্র। আনন্দ পাবলিশাস প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা। প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০০২।

১১. রাজশেখর বসু: পরশুরাম গল্পসমগ্র, পত্রভারতী,কলকাতা। প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২১।

১২. Hans Christian Andersen: ‘The Snwo Queen’. Hans Andersen: Fairy Tales (A selection). Oxford University Press, Oxford. 1959.