সমগ্র জীবন একই দুঃখ-বেদনা, আনন্দ-উল্লাস, ব্যঙ্গ-কৌতুক, বাদ-প্রতিবাদ, ঘুরে ঘুরে, আল্পনার ব্রতের মতো বলে গেছেন তিনি, কলাকৈব্যবাদের ছলাকলাকে ষোলকলা দেখিয়ে, ব্যক্তির যন্ত্রণাকে সমষ্টির সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন, মানুষকে তিনি মেপেছেন সহজ দাঁড়িপল্লায়, দড়ির মতো কুণ্ডলী পাকানো সমাজের মাঝে বসে, মনে হতে পারে মানুষে মানুষে সম্পর্ক উন্মোচনে তিনি নিদারুণ খেয়ালি, কিন্তু খেয়াল করলে বোঝা যায়, কতটা গভীর তাঁর বিস্ময় জাগানো সংবেদনশীল মন, এজন্যই তিনি আধুনিকতার প্রতিভূ হয়ে উঠতে পেরেছেন, এজন্যই তিনি হয়ে উঠতে পেরেছেন বাস্তববাদ ও নয়া বাস্তববাদের গণ্ডি পেরুনো এক নির্মাতা, ইতালির সিনে-কম্প্রাদরদের প্রতিকূলে দাঁড়ানো এক শিল্পী, পুরো বিশ্বের দরবারে তিনি হয়ে উঠতে পেরেছেন প্রিয় ফেদেরিকো ফেলিনি।
ফেলিনিকে মানুষ নানা মতিচুর সংজ্ঞায় আবদ্ধ করার প্রয়াস পেয়েছেন, কেউ বলেছেন তিনি ‘নয়াবাস্তববাদী’, আবার কেউ বলেছেন তিনি ‘পরাবাস্তববাদী’। তাঁর কাজকে কেউ বলেছেন অতিরঞ্জিত ও অসংযত হলেও দুঃসাহসী। তবে সবকিছু ছাপিয়ে, চলচ্চিত্র শিক্ষক ম্যানুয়েলা জ্যেরি ঠিকই বলেছেন, তিনি অতর, অর্থাৎ চলচ্চিত্র লেখক। ফেলিনির এই অতর হয়ে ওঠার পেছনে নিঃসন্দেহে সময়ের প্রভাব রয়েছে। একশ বছর আগে তিনি যখন অ্যাড্রিয়াটিক সাগর পাড়ের ছোট শহর রিমিনিতে জন্মগ্রহণ করেন, ১৯২০ সালের ২০ জানুয়ারি, তখন সদ্য এক নম্বর বিশ্বযুদ্ধ খতম হয়েছে, পৃথিবী ধুকছে, বিশ্ব পুঁজিবাদ নয়া বাজার খোঁজার লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও, সামনে আবার দুই নম্বর বিশ্বযুদ্ধের পাঁয়তারা করছে, ওদিকে সোভিয়েত রাশিয়ায় বলশেভিকরা লাল ঝাণ্ডা উড়িয়ে দিয়েছে, ইতালিতেও চলছে সর্বহারাদের রাজত্ব কায়েমের জোর প্রচেষ্টা, আন্তনিও গ্রামশি চাইছেন নতুন তর্জমায় কার্ল মার্কসের তত্ত¡কে নিছক করতে, আর সমাজতান্ত্রিক নেতাদের চোখের সামনেই শক্তি সঞ্চয় করছে ফ্যাসিবাদ। যুদ্ধ বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে নেকড়ে বেনিতো মুসোলিনি তখন নেতার মুখোশ পড়েছেন। ফেলিনি যখন ছেলেবেলা পার করে, কৈশোরকে উত্তীর্ণ করে, তরুণ হচ্ছেন, তখন তাঁর চারপাশে ফ্যাসিবাদের উত্থান, ভিন্ন মতাবলম্বীদের উপর নিষ্ঠুরতা, যুদ্ধ, ভেঙে পড়া অর্থনীতি, ধনীদের নির্লজ্জ বিলাসের বিপরীতে নির্দয় দারিদ্র, নারী পুরুষ নির্বিশেষে বেঁচে থাকার নৈমিত্তিক সংগ্রাম— এক মহা নৈরাজ্য বিরাজ করছে। এই নৈরাজ্যের ভেতরেই ফেলিনি আবিষ্কার করতে পেরেছেন জীবনের ছন্দ, এজন্যই তার ভালোবাসার চলচ্চিত্রেও দেখা মেলে কিঞ্চিত নৈরাজ্যের। মনে হতে পারে, ছবিতে বিপুল সংখ্যক চরিত্রের সমাবেশ ঘটিয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেন ফেলিনি, কিন্তু ওটার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান অন্তঃমিল, প্রতিষ্ঠা করেন শৃঙ্খলা।
ফেলিনির ছবি যারা দেখেছেন তারা জানেন, তাঁর ছবিকে এগিয়ে নিয়ে যায় সরল-জটিল-উদ্ভট-পাগলাটে-বিরল-বিচিত্র সব চরিত্ররা। এই চরিত্রদের দেখা যায় সমুদ্রতটে, হোটেল লবি বা বড়লোকী বৈঠকখানায়, বেশ্যালয়ে, কখনো সার্কাস, থিয়েটার ও মঞ্চের পরিবেশনায়, কখনো দেখা যায় এরা লোকারণ্যে জনান্তিকে, কখনো বা ভিড়ভাট্টায় নিজের সাথে নিজে কথোপকথনে ব্যস্ত। ফেলিনি ভিড় পছন্দ করতেন। ছবির জন্য চরিত্র বাছাই করার ছুতোয় প্রচুর লোক আমন্ত্রণ জানাতেন। আর তাদের ভেতর থেকেই তিনি পেয়ে যেতেন ছবির জন্য কাক্সিক্ষত চরিত্র বা পরবর্তী ছবির জন্য কোন চরিত্রের আভাস। নিজের ছায়া তিনি প্রায়ই বসিয়ে দিতেন চরিত্রের ভেতর। যেমন গুইডো (এইট অ্যান্ড অ্যা হাফ, ১৯৬৩), নয় নম্বর ছবি করতে এসে খেই হারিয়ে ফেলা এক পরিচালক, এই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মার্চেলো মাস্ত্রইয়ানি, গুইডোকেও আমরা দেখি চরিত্র বাছাই করতে করতে ক্লান্ত, প্রডাকশনের লোকেরাও শ্রান্ত। কাউকেই পছন্দ হচ্ছে না পরিচালকের, বিশেষ করে নায়িকা। চরিত্র বাছাবাছির ভেতরেই গুইডো ডুব দেয় অচেতনে। উঠে আসতে থাকে পরিচিত, অর্ধপরিচিত, বিস্মৃত বহু নারীর মুখ। মার্চেলো অভিনীত ফেলিনির আরেকটি ছবি ‘সিটি অব উইমেনে’ও (১৯৮০) আমরা দেখি স্ন্যাপোরাৎস চরিত্রের অচেতনে ফিরে আসছে শৈশব ও কৈশোরে দেখা নারীরা। যাহোক, ‘সাড়ে আট’ ছবিতে নয় নম্বর ছবির জন্য চরিত্র দরকার, হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি চলছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে গল্পটা কি হবে সেটাই খুঁজে পাচ্ছে না গুইডো। শুধু স্মৃতি থেকে উঠে আসছে ফেলে আসা চরিত্ররা। এদিকে প্রযোজক বিরক্ত। অভিনয় শিল্পী যারা এসেছে তারা দ্বিধান্বিত। স্ত্রী যারপরনাই ক্ষিপ্ত। পরিচালক স্বামীর নিশ্চয় কোন চক্কর চলছে। চক্কর তো আছেই, তবে সেটি নারীঘটিত নয়; ঘূর্ণন সৃষ্টিকে ঘিরে, সৃষ্টির ভেতরকার চরিত্রদের ঘিরে। সেখানে নারী যেমন আছে, তেমনি আছে ছেলেবেলায় পড়া মিশনারী স্কুলের যাজক, বন্ধু, এমনকি সৈকতে দেখা এক যৌনকর্মীও। স্মৃতি ও বাস্তবের সব চরিত্র মাথায় এসে গিজগিজ করছে। ওদিকে, নতুন ছবিতে নতুন কিছু করার চাপ যেন গুইডোকে আটকে দিয়েছে বরফ জমাট বাধা কোন যানজটে। ছবির শুরুতেই আমরা দেখি, সেই জট থেকে সে পালাতে চায়, সবকিছুর উর্ধ্বে উঠতে চায় সে, কিন্তু পা তো বাঁধা নিচে। পতন অনিবার্য। অর্জিত সাফল্য থেকে ছিটকে পড়ার ভয়, অসুখী দাম্পত্য জীবন, সৃষ্টিশীল থাকার চাপ সামাল দিতে দিতে গুইডো সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, এই ছবি আর সে করবে না। মাঝপথ থেকে সে ফিরে আসে। প্রযোজকের কাজই হলো অর্থ গচ্চা দেয়া, সে দেবে। কিন্তু এই যাত্রা আর পূরণ করবে না গুইডো। কথা ছিলো সে কল্পবিজ্ঞান ছবি বানাবে। মঙ্গল গ্রহ থেকে আসবে অ্যালিয়েন। ছবির শেষে দেখা যায়, গুইডোর চরিত্ররা সেই আধাপাকা নভোযান থেকে মর্ত্যে নেমে আসছে। এরপর সার্কাসের ঢঙে তারা পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে চক্কর দিচ্ছে মাঠ। সেই চক্রে গুইডো নিজেকে সমর্পন করে। কিন্তু শেষোব্দি বাঁশি বাজাতে থাকে সেই ছেলেবেলা। সেটাই যেন গুইডোর শেষ আনন্দ আশ্রম। গুইডোর চরিত্রটি অচেতনে আটকে থাকে, ছেলেবেলার বালুকাবেলায়।
ফেলিনির চরিত্ররা মনে হয় ভিনগ্রহ থেকেই আসা। নয় তো দুঃখিনী জেলসোমিনা (লা স্ত্রাদা, ১৯৫৪) কেন এক স্বল্প পরিচিত সার্কাসের দড়িখেলা দেখানো এক বেহালাবাদকের হত্যা মেনে নিতে না পেরে খাওয়াদাওয়া ভুলে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কাছে নিজেকে সপে দেবে? জেলসোমিনা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন দক্ষ অভিনেত্রী, ফেলিনি পত্নী জুলিয়েত্তা মাজিনা। তিনিও ফেলিনির মতো ৭৩ বছরের জীবনই পেয়েছিলেন। জন্মেছিলেন ফেলিনির জন্মের এক বছর পর, ১৯২১ সালে, আর মৃত্যুবরণও করেছিলেন ফেলিনির মৃত্যুর এক বছর পর, ১৯৯৪ সালে। মাজিনা ছিলেন ফেলিনির প্রেরণার জায়গা। ফেলিনি বলছেন, “জুলিয়েত্তা, ...আমার বাছাই-করা কোন মুখ মাত্র নয়, আসলে সে বহু ছবির আত্মা।”
ফেলিনির পথের পাঁচালীতে (ইতালিতে ‘স্ত্রাদা’ মানে পথ) মাজিনার সহঅভিনেতা ছিলেন অ্যান্থনি কুইন, তিনি জাম্পানো চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ফেলিনিকে নিয়ে বানানো এক প্রামাণ্যচিত্রে (কারম্যান পিচিনি পরিচালিত ‘দ্য ম্যাজিক অব ফেলিনি’, ২০০২) অ্যান্থনি জানান, নিজের স্ত্রীকে মূল চরিত্রে ঢুকিয়ে দেয়ায় কম সমালোচনা সহ্য করতে হয়নি ফেলিনিকে, তবে সেটার জবাব মাজিনা দিয়েছেন অভিনয়ের মাধ্যমে। জেলসোমিনা চরিত্রটি, বোন মারা যাওয়ার পর জুড়ে যায় পথেঘাটে সার্কাস দেখানো চালচুলোহীন জাম্পানোর সাথে। গোঁয়ার ধরনের লোক জাম্পানো। সার্কাস-খানাপিনা-পয়সা-নারী এগুলোর বাইরে তার আর কোন দুনিয়া নেই। সে প্রেম বোঝে না। তারপরও অর্থনৈতিকভাবে অসহায় জেলসোমিনা তাকে প্রেম নিবেদন করে, বিয়ে করতে চায়। পাথরে কি ফুল ফোটে!
জেলসোমিনা আসল প্রেমের সন্ধান পায় দড়ির উপর হেঁটে যাওয়া বেহালাবাদক ইল মাতোর (রিচার্ড বেজহার্ট) মধ্যে। ইল মাতোর চরিত্রটি খুব অল্প সময়ের জন্য এলেও, দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়। ইল মাতোই আসলে জেলসোমিনাকে বোঝায়—প্রেম দূর থেকে ভেসে আসা মনকে এফোঁড় ওফোঁর করে দেয়া এক করুণ, বিষাদমাখা সুর মাত্র। যারা ছবিটি একবার দেখেছেন, জেলসোমিনার ট্রাম্পেটে বাজানো সেই সুর আর কখনো ভুলবেন না। কেমন করে ওরকম সুর তৈরি করা যায়! মধুমাখা বর্শির মতো ওই সুর ভোলেনি পাথর হৃদয় জাম্পানো। সে পাগলপ্রায় জেলসোমিনাকে একা ফেলে এসেছিল দূরের এক নির্জন স্থানে। ভেবেছিল মাথা থেকে বোঝা নামল। বছর পাঁচেক পর সেই পরিচিত সুর শুনে উতলা হয়ে ওঠে জাম্পানো। খোঁজ নিয়ে সে জানতে পারে জেলসোমিনা শুধু সেই সুরকে সঙ্গে নিয়েই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল, পাঁচ বছর আগেই। এই খবর জাম্পানোর কঠিন হৃদয়কে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়। সে সাগর পাড়ে গিয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকে। বোঝা গেলো, পাথরের হৃদয়েও ফুল ফুটিয়েছিল জেলসোমিনা। কি অদ্ভুত চরিত্র এই জাম্পানো, আর কি অপূর্ব প্রাণ এই জেলসোমিনা! আর দুজনের মাঝে হারানো সুর হয়ে ঝুলে রইল সেই ইল মাতো। এমন ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী কে কবে দেখেছে, এর আগে? ফেলিনি দেখিয়েছেন। ছবিটি সম্পর্কে ¯্রষ্টা বলছেন, “জাম্পানো আর জেলসোমিনা নামে এক জোড়া নারী ও পুরুষ, পরস্পরকে বোঝার পক্ষে স্বভাবের দিক থেকেই যারা আলাদা— তাদের মধ্যে অপ্রাকৃত ও ব্যক্তিগত আদানপ্রদানের সূত্রটুকু সেখানে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ছবিকে যারা আক্রমণ করেছে, আমার মনে হয় প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক লেনদেন ছাড়া তারা আর কোন কিছুতে বিশ্বাস করে না।”
ফেলিনি বিশ্বাস করতেন একটি ছবি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সুস্পষ্ট উপস্থাপন ছাড়াই অন্য খাঁটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ছবির চেয়ে ঢের বেশি বাস্তববাদী হয়ে উঠতে পারে। তাঁর ছবির পরতে পরতে এর সত্যতা মিলবে। মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠের মতো সমাজের ধনী আর দরিদ্র শ্রেণীর দেখা মিলবে, দেখা মিলবে ফ্যাসিবাদী শাসক ও শোষিতের, দেখা মিলবে উপাসনালয় ও বেশ্যালয়ের। সাধারণ স্মৃতিচারণের মতো করে ফেলিনি এই বিষয়গুলোকে নিয়েই তৈরি করেন কোলাজ, নির্মাণ করেন মোটিফ। সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য নেই তাতে, কিন্তু কি ভীষণরকম রাজনৈতিক! নিজের নামে এক চরিত্রের নাম রেখেছিলেন: ফেলিনি (রোমা, ১৯৭২), পিটার গনজালেস অভিনয় করেছিলেন তাতে, চরিত্রটি ত্রিশের দশকের শেষের দিকে, যখন ইতালিতে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম রয়েছে, তখন রোমের এক অতিথিশালায় ওঠে। সেখানে উদ্ভট সব লোকের বাস। এমনকি মুসোলিনির মতো দেখতেও এক লোক রয়েছে সেখানে। ছবির ফেলিনি নিজে সাংবাদিক, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা। আধা-আত্মজৈবনিক ধাঁচে গড়া এই চরিত্র রোম শহরে নতুন এসেছে, সে আগন্তুক। একজন আগন্তুকের চোখে সে রোমের গরীবি ব্রোথেল দেখে, আবার বড়লোকী ব্রোথেলও দেখে। একই ছবিতে পরিচালক দর্শককে একেবারে পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা যৌনকর্মীদেরও দেখিয়ে দেন। দেশটির অর্থনীতি যে নাজুক অবস্থায় আছে, সেটা বোঝাতে আলাদা করে আর প্রামাণ্যচিত্র তৈরির দরকার আছে কি? তো ছবির চরিত্র ফেলিনি ধনী ব্রোথেলে গিয়ে এক যৌনকর্মীর প্রেমে পড়ে যায়। এই নারী যেন খোদ রোম। শহর ও নারী উভয়ই তরুণ ফেলিনির চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।
পর্দায় এক পর্যায়ে ব্যস্ত রাস্তায় সত্যিকারের ফেলিনিকে শুটিং করতে দেখা যায়। বৃষ্টির কারণে রাস্তা জলাবদ্ধ, কোথাও দুর্ঘটনা ঘটেছে, গাড়ি উল্টে আছে, তীব্র যানজট, এর ভেতরেই এক অযান্ত্রিক ঘোড়া দৌড়ে চলেছে গাড়ির ফাঁকফোকড় দিয়ে, রাস্তায় নেমেছে প্রতিবাদ মিছিল, পুলিশের ব্যারিকেড, অন্য গাড়ি বাধা পেয়ে বিকল্প রাস্তার সন্ধানে, মুহুর্মুহু ভেঁপুর শব্দ, যেন এক শহুরে দোজখ। এই নৈরাজ্যের শহর ছেড়ে পরের দৃশ্যে ফেলিনি আমাদের দেখান সবুজ পার্ক, সেখানে শুধু শুটিং নয়, চলে পরিচালক ফেলিনির সাক্ষাৎকার। কখন যে তিনি এই ছবিতে আমাদেরকেও তরুণ ফেলিনির মতো দর্শকে পরিণত করে দেন তা বোঝাই যায় না। আমরাও হয়ে উঠি এই ছবির চরিত্র। আমরা ফেলিনির সাথে রোমের ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখি, বিশৃঙ্খল রাস্তাঘাট দেখি, বিনোদন ঘর ভডভিলে শো দেখি। মজার বিষয় এই ভডভিলের শোতে চরিত্র ফেলিনি গৌন হয়ে যায়। প্রধান হয়ে ওঠে বিনোদন উপভোগ করতে আসা দর্শকেরা। এবার এরাই মূল চরিত্র। বখাটে, ঘুম কাতুরে, মনোযোগী, উত্যক্তকারী, বিরক্তিকর, গুন্ডা— কতরকম চরিত্রের যে দেখা মেলে এখানে। আর মঞ্চে যারা নাচ, গান, কৌতুক পরিবেশন করছে, তাদের বর্ণিল উপস্থিতি তো আছেই। ফেলিনি হলেন রূপালি পর্দায় বিচিত্র চরিত্রের সমাবেশ ঘটানোর মাস্টার। যাহোক, এরমধ্যেই নানা ঘটনা ঘটছে। মঞ্চে বিনোদনের মাঝেই বিরতি নিয়ে যুদ্ধের সর্বশেষ খবর পড়ে শোনানো হচ্ছে। যুদ্ধবিমান আসছে, বাজানো হচ্ছে সাইরেন। সকলে ঢুকে পড়ছে বাঙ্কারে। ভোক্তা আর যোগানদাতায় তখন কোন তফাৎ নেই। প্রত্যেকটি মুখে তখন যুদ্ধের কালো ছায়া। এটাই ফেলিনির যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য।
‘রোমা’ ছবিতে আরেকটি দৃশ্যের কথা না বললেই নয়, সেটি হলো তরুণ ফেলিনি যখন টানেলের কাজের অগ্রগতি দেখতে যায়, তখন রোমের পাতালে থাকা এক ক্যাটাকম্ব আবিষ্কৃত হয়। এসব ক্যাটাকম্বে মাটির নিচে পাঁচতলা সমান খুড়ে ধর্মীয় আবহে লাশ সমাহিত করা হতো, ইতালিতে এই চল শুরু হয় খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে। এসব সমাধিতে প্রবেশের জন্য থাকতো বিশেষভাবে নির্মিত সরু পথ, আর ভেতরে থাকতো প্রার্থনা স্থান ও সমাধিস্থল। দেয়ালে আঁকা হতো খ্রিস্টিয় কাহিনী সম্বলিত ফ্রেস্কো। তো আধুনিক যোগাযোগের টানেল খুড়তে গিয়ে যখন এই ক্যাটাকম্ব আবিষ্কৃত হলো, সঙ্গে ফ্রেস্কো, তখন সকলে বিস্মিত হয় শিল্পকর্ম দেখে। মনে হয় এই কদিন আগের আঁকা। এতো জলজ্যান্ত! কিন্তু টানেলের ছিদ্র দিয়ে যখন বাইরের হাওয়া হুহু করে প্রবেশ করতে থাকে সমাধির ভেতরে, তখন কর্পূরের মতো উবে যেতে থাকে ফ্রেস্কো। হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে থাকে দেয়ালে আঁকা চরিত্রগুলো। আধুনিক যুগের বিষাক্ত হাওয়া অতি পুরনো ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে যেন উধাও করে দেয় নিমিষেই। এটাই ফেলিনির আধুনিকতার বিধ্বংসী রূপ নিয়ে বক্তব্য।
এই ছবিতে রাজনৈতিক বক্তব্যও তুলে ধরতে দেখা যায়। রোমের এক রেস্তোরাঁর পাশে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরতদের পুলিশ পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়, আর যারা রেস্তোরাঁয় বসে খাচ্ছিল, তারা নিরব দর্শকের মতো তাকিয়ে থাকে ওদিকে। আরো একদল নিরব দর্শকের দেখা মেলে এই ছবিতে। যেখানে আমরা দেখি বিশপ, কার্ডিনাল, ফাদার ও সিস্টারদের জন্য কেমন পোশাক নির্ধারিত হবে ভবিষ্যতে, সেজন্য আয়োজন করা হয় ফ্যাশন শোয়ের। আয়োজনের অন্ধকারে বহু নিরব দর্শক থাকলেও, ধর্মগুরুদের চরিত্র ফেলিনি আঁকেন কেরিক্যাচারের মতো করে। যারা মডেল হয়ে নতুন পোশাক পরিধান করে আসছে, তাদের চরিত্রায়নও করেছেন দেখার মতো করে। যেন সার্কাসের ক্লাউন। ফেলিনি নিজে দুর্দান্ত কার্টুন আঁকিয়ে, কাজ করেছেন ব্যঙ্গ পত্রিকায়। কাজেই তিনি জানেন কি করে ব্যাজস্তুতি করতে হয়। ‘সাড়ে আট’ ছবিতেও চার্চের প্রতি সমালোচনার রূপ আমরা দেখি। তাঁর ‘আমারকর্দ’ (১৯৭৩) ছবিটিতেও রয়েছে যাজকদের প্রতি ব্যঙ্গ।
অন্তঃসারশূন্য খ্রিস্ট মন্ডলীর ধর্মগুরুরা নিজেদের কঠোরভাবে অবদমিত বাসনার কারাগারে বন্দী। ফেলিনি ‘আমারকর্দ’ ছবির ছোট্ট এক দৃশ্যে সেটা আমাদের দেখান। আমরা দেখি, এক যাজকের কাছে গিয়ে তিত্তা (ব্রুনো জেনিন) নামের এক বয়োসন্ধিকালের বালক পাপস্বীকার করছে এবং সে বলছে তার নারী বাসনার কথা। যাজক সেই বর্ণনা বেশ উপভোগ করছে। এমন হাস্যকর ধর্মগুরুদের প্রায় প্রত্যেক ছবিতেই হাজির করেন ফেলিনি। শুরুতেই বলেছি ফেলিনি নিজের স্মৃতি, অনুভূতি ও প্রতিবাদ জারি রাখেন ব্রতের আকারে। নানা মাত্রার চরিত্র আর ছোট ছোট দৃশ্যের মাধ্যমে। এখানেও ফ্যাসিবাদ বিরোধী বক্তব্য দেখি। দেখি আলো চলে গেলে ভয়ে দিকবিদিক ছুটোছুটি শুরু করে মুসোলিনির সেনারা, আর কমিউনিস্টদের খোঁজা শুরু করে এদিক সেদিক। এসময় বেহালার সুর ভেসে আসে। আরো ভীত হয়ে গীর্জার ঘন্টা লক্ষ্য গুলি ছুড়তে শুরু করে তারা। তাদের এই নির্বুদ্ধিতা যেন গীর্জার ঘন্টায় প্রতিধ্বনি হয়ে বাজতে থাকে— ঢং ঢং ঢং। এ ঘটনার জেরে তাদের ডেরায় ধরে আনা হয় তিত্তার বাবাকে, সে আবার সমাজতন্ত্রের সমর্থক। বিনা কারণে কেন তাকে ধরে আনা হয়েছে জিজ্ঞেস করলে রাতভর চলে মারধোর।
ফ্যাসিস্ট সেনাকর্মকর্তাদের চরিত্র এই ছবিতেও ফেলিনি তুলে ধরেন কার্টুন চরিত্রের মতো করে। কুচকাওয়াজে বহন করা মুসোলিনির যে ছবি তিনি দেখিয়েছেন, তা দেখলে যে কারো হাসি পাবে। মুসোলিনির ফুলেল রক্তচক্ষুর সামনেই এক কিশোর কল্পিত বিয়ের আসরে নিজেকে বর ভাবতে শুরু করে দেয়। এই কিশোর কিন্তু একা নয়, এরা পুরো একটি দল, দুষ্টু ছেলের দল। এই চরিত্রগুলোও ফেলিনি তৈরি করেছেন নিজের অভিজ্ঞতাসার থেকে। উঠতি বয়সের ছেলেদের নারী শরীরের প্রতি যে টান থাকে, যে কল্পনার ফানুস ওড়ে, রয়েছে তার অনুপুঙ্খ বর্ণনা। কোন চরিত্রকেই খুব বেশি ভরকেন্দ্রে রাখছেন না ফেলিনি, কিন্তু ঠিকই বেশ কয়েকটি চরিত্রকে পুঁজি করে, শতশত চরিত্র তাঁর দৃশ্যে ঢুকে পড়ছে, বেরিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝেই যা বলার, চার্চের সমালোচনা, ফ্যাসিবাদের পিণ্ডি চটকানো, মানবিক সম্পর্কের ঠুনকো দিক— সবটাই বলে দিচ্ছেন।
আবার ঠুনকো মানবিক সম্পর্কের উল্টো দিকটাও ফেলিনি বলতে চান ‘আই ভিতেলনি’ (১৯৫৩) ছবিতে। পাঁচ বন্ধুর কথা বলা হয় এখানে। ইতালিয় ভাষায় ‘ভিতেলনি’ মানে বাছুর। এদের গরু বলে গাল দেয়ার কারণ, এরা অকম্মা তো বটেই, কারো দায়িত্ব নিতেও অপরাগ। অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের পাড়ে ছোট্ট শহরে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ হয় স্যান্ড্রা (লেওনোরা রুফো), সে পাঁচ বাছুরের একজন মোরালদোর (ফ্রাঙ্কো ইন্তারলেঙ্গি) বোন। তো স্যান্ড্রা আবার সেই ‘পঞ্চপাণ্ডব’দেরই একজন ফাউস্তোর (ফাঙ্কো ফেব্রিৎজি) সন্তান ধারণ করে গোপনে। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ফাউস্তো পালিয়ে যাওয়ার জোগাড় করে। কিন্তু বন্ধু মোরালদোর অনুরোধ ও ঘরে পিতৃদেবের মারের চোটে সে রাজি হয় স্যান্ড্রাকে বিয়ে করতে। বিয়ে-থা করার পর বাচ্চার বাপ হওয়া সত্ত্বেও লাম্পট্য কমে না ফাউস্তোর। অশান্তি তৈরি হয় দুই পরিবারেই। আর স্যান্ড্রা বারবারই তার লম্পট স্বামীকে বিশ্বাস করে, আর প্রতারিত হয়। শেষ পর্যন্ত স্যান্ড্রা অন্ধ বিশ্বাসটাই জারি রাখে, আর ফাউস্তোর সাথে সংসার টিকিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখে। এই পাঁচ বন্ধুর ভেতর আমরা দেখি দিবাস্বপ্নে বিভোর অ্যালবের্তোকে (অ্যালবের্তো সরদি), মা আর বড় বোনের উপর নির্ভরশীল অ্যালবের্তো কষ্ট পায় যখন দেখে তার বড় বোন এক বিবাহিত ধনীর সাথে পালিয়ে যাচ্ছে। দারিদ্র নিয়ে আর কয়জন মরতে চায়? আরেক বন্ধু লিওপোলদো (লিওপোলদো ত্রিয়েস্তে) নাট্যকার হতে চায়। তার ধ্যান ও জ্ঞান নাট্যরচনায়। বাস্তবের সাথে তার হয় নাকো দেখা। আরেক বন্ধু রিকার্ডো (রিকার্ডো ফেলিনি), এই চরিত্রটির উপর ফেলিনি খুব একটা আলো ফেলেননি। পাঁচ বন্ধুর ভেতর ফাউস্তো ও মোরালদোকে দেখি দুই বিপরীত চরিত্রের মানুষ। ফাউস্তো, স্ত্রীকে সিনেমা হলে বসিয়ে রেখে পিছু নেয় পাশে বসা অপরিচিত নারীর। স্ত্রী ও সন্তানকে বাড়িতে রেখে রাত কাটায় আরেক নারীর সাথে। হামলে পড়ে দোকান মালিকের স্ত্রীর উপর। চাকরি থেকে বের করে দিলে সেই মালিকের দোকান থেকেই মূর্তি চুরি করে। অপরদিকে, মোরালদো হলো বন্ধু অন্তঃপ্রাণ। সে বন্ধুর ওয়াস্তে বোন স্যান্ড্রার কাছ থেকে ফাউস্তোর সব অপকর্ম লুকিয়ে রাখে। মোরালদোর কাছে বোনাই (বোন জামাই) বড়, বোনের চেয়ে। বোনাই যে তার বন্ধু! আরেক বন্ধু অ্যালবের্তোর প্রতিও তার টান চোখে পড়ে। কিন্তু সকল টান ছিন্ন করে এক ভোরে সে উঠে পড়ে এক ট্রেনে অজানা ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে। বন্ধু ফাউস্তো যে অবিচার করেছে তার বোনের প্রতি, সেখান থেকেই অভিমান ও ক্ষোভের জন্ম হয়। তাই কাউকে কিছু না বলে মোরালদো নিরব প্রতিবাদ জানিয়ে নিজের প্রিয় শহর ছেড়ে চলে যায়। পেছনে পড়ে থাকে পরিবার-বন্ধু-পরিচিতজন।
আবার ফাউস্তো ও মোরালদো এই দুই চরিত্রের মিশ্রণ আমরা দেখি সাংবাদিক মারচেলোর (লা ডলচে ভিতা, ১৯৭০) ভেতরে, এই চরিত্রে নিজের নাম নিয়েই অভিনয় করেছেন মার্চেলো মাস্ত্রইয়ানি। বাগদত্তা থাকা সত্তে¡ও মার্চেলো একাধিক নারীসঙ্গ পেতে উদগ্রীব এবং এক নারীর প্রেমের বাঁধনে সে জড়াতে চায় না। ছবির শুরুতেই দেখা যায়, যীশুর নতুন মূর্তি সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে বসানো হবে, তাই হেলিকপ্টারে করে মূর্তিটিকে উড়িয়ে নেয়া হচ্ছে। পেছনে একে আরেক হেলিকপ্টারে অনুসরণ করছে সাংবাদিক মার্চেলো। উড়তে উড়তেই তার নজরে পড়ে এক ছাদের উপর বিকিনি পরা সূর্য স্নানরত তিন তরুণীর উপর। খবরের পেছনে ছোটা বাদ দিয়ে, সে হেলিকপ্টার ছাদের কাছে স্থির করায় এবং ঐ নারীদের কাছে ফোন নাম্বার চায়। নাম্বার পেতে ব্যর্থ হয় সে। এরপর দেখা যায় ঘরে বাগদত্তা এমাকে (ইভোনে ফারনো) প্রতীক্ষায় রেখে রোমের এক যৌনকর্মীর ঘিঞ্জি কামরায় মার্চেলো রজনীযাপন করছে উত্তরাধিকার সূত্রে ধনী ও সর্বদা উত্তেজনা সন্ধানী তরুণী ম্যাডেলিনার (আনুক অ্যাইমে) সাথে। এমা ভীষণ রকম অধিকার খাটায়, তাই হয় তো মার্চেলো মুক্তি খোঁজে যৌন স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ম্যাডেলিনার কাছে, এমনটা মনে হতে পারে দর্শকের। কিন্তু এই ধারণা ভুল, বিখ্যাত সুইডিশ-আমেরিকান অভিনেত্রী সিলভিয়ার (আনিতা একবারি) আগমনের সাথে সাথে মার্চেলো তার নজর কাড়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। কিছুটা সমর্থও হয়, কিন্তু ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায় সিলভিয়ার ছেলেবন্ধু রবার্ট (লেক্স বার্কার)। প্রেমিকা সিলভিয়াকে চড় মেরেই থেমে থাকেনি ক্ষিপ্ত রবার্ট, মার্চেলোর কপালেও জোটে কিলঘুষি। আবেদনময়ী সিলভিয়ার প্রেমে মার্চেলো কয়েকদিন হাবুডুবু খেলেও, পরে সেটি সে সামলে ওঠে।
শুধু নারীদের পেছনে ছোটা সাংবাদিক অবশ্য নয় মার্চেলো। আধ্যাত্মিক ঘটনার উপর প্রতিবেদনও তৈরি করতে হয় তাকে। শোনা যায়, শহরের অদূরে এক ছোট মেয়েকে দর্শন দিয়েছেন কুমারী মারিয়া। বালিকার মাধ্যমেই অন্যদের আশীর্বাদ করেন যীশুমাতা। এটা চাউর হওয়ার পর পুরো এলাকা যেন ভেঙে পড়ে ওই ছোট্ট মেয়েটির পায়ের তলায়। সুস্থ হওয়ার বাসনা নিয়ে ভিড় জমায় অসুস্থরাও। পরে হুড়োহুড়িতে এক অসুস্থ মানুষ প্রাণ হারায়। আর গোটা ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, মা মারিয়ার দর্শন পাওয়ার খবরটি ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়। ফেলিনি ঠিক ঠিক সমালোচনা করে দিলেন রোমের খ্রিস্টবিশ্বাসীদের। তিনি শুধু সাংবাদিক মার্চেলোকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন ঘটনাস্থলে। বাকিটুকু দর্শক বুঝে নিয়েছে।
এরপর ফেলিনি মার্চেলো ও এমাকে নিয়ে যান বন্ধু, বুদ্ধিজীবী স্টেইনারের (অ্যালেইন কুনি) বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের এক পার্টিতে। সেই পার্টিতে আমন্ত্রিতদের কেউ কবি, গায়ক, দার্শনিক। মার্চেলো শুধু নয়, তার বাগদত্তা এমাও স্টেইনারের মতো জীবনযাপন প্রত্যাশী। অথচ সেই জীবন যে কত ক্ষণস্থায়ী, সেটা বোঝা যায় যখন দর্শক দেখে নিজের দুই বাচ্চাকে হত্যা করে, নিজে আত্মহত্যা করে স্টেইনার। নিজের জীবন ও বাচ্চাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং ভোগবাদ ও আধাত্মবাদের টানাপোড়েন নিয়ে স্টেইনার আলাপ করেছিল মার্চেলোর সাথে। বোঝা যায়, ভেতরে ভেতরে স্টেইনার চরিত্রটি ভীষণ একা, শঙ্কিত আর হতাশাগ্রস্ত ছিলো। মার্চেলোকে ঘিরে এমন আরো অনেক চরিত্রের সমাহার করেন ফেলিনি। তবে এতটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়, শত ভিড়ের মাঝেও এই মার্চেলো একা ও অস্থির আত্মা। বন্ধনের জালে বারবার জড়াতে চায়, কিন্তু সেটাতে আটকে গিয়ে জীবন দুর্বিসহ করে তুলতে চায় না। শেষ দৃশ্যে সমুদ্র পাড়ে জেলেদের জালে সেই আটকে পড়া মৃত শাপলা পাটা (স্টিংরে) মাছের স্থির চোখ হতে চায় না মার্চেলো। তবে সে নিশ্চিত করেই জানে, এক অদৃশ্য মায়াজাল তাকে ঘিরে রয়েছে। মানুষ মাত্রই তাই। এই অনিবার্য নিয়মের জালে আটকে থাকা মানুষ তাই প্রতিনিয়ত স্বীকৃতি খোঁজে, আত্মাকে স্থির করতে সে বাসনা পূরণের খেলায় লিপ্ত হয়। এ যেন নিজেকেই নিজে বোকা বানানোর এক নিরন্তর চেষ্টা।
ফেলিনি বোকা বোকা চরিত্র নিয়েও কাজ করেছেন। বিশেষ করে যদি বলি, তাঁর ছবির সং বা ক্লাউনেরা। তারা সকলের সামনে বোকা সেজে বোকাবোকা সব কাজ করে, লোক হাসায়। ফেলিনি এই ক্লাউনদের পছন্দ করতেন। হয় তো সেই ছেলেবেলার প্রভাব। আনুমানিক আট কি নয় বছর বয়সে স্কুল থেকে পালিয়ে সার্কাস দলে ভিড়েছিলেন। বেশ কিছুদিন সার্কাসে কাটিয়ে তিনি ১৯৩৮ সালে ফ্লোরেন্সে চলে যান, সেখানে কমিক স্ট্রিপ আঁকা শুরু করেন ব্যঙ্গ পত্রিকা ‘৪২০’-এর জন্য। ফেলিনির অঙ্কনেও ঐ ক্লাউনদের বড্ড প্রভাব, তারা বারবার ফিরে এসেছে। ফেলিনি মনে করেন, “প্রত্যেক সন্ধ্যায় হাততালি পাওয়া নিশ্চয়ই দারুণ ব্যাপার। যে-কারণে ক্লাউনদের বয়স বাড়ে ধীরেসুস্থে, দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকে তারা। দৈনিক বাহবা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো।”
১৯৭০ সালে ফেলিনি একটি মকুমেন্টারি তৈরি করেন: ‘দ্য ক্লাউনস’, কেউ কেউ বলেন এটাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম মকুমেন্টারি, তো এই ছবিতে তিনি জীবিত ও মৃত ক্লাউনদের কথা বলেন, রোম ও প্যারিসের ক্লাউনদের খোঁজখবর নেন, সার্কাসে ক্লাউনদের পরিবেশনাও দেখান। তিনি সর্বদা উপস্থিত থাকেন এই ছবিতে, কখনো সশরীরে, কখনো বা অদৃশ্যে। ফেলিনিকে ঘিরেই যেন ক্লাউনদের মেলা। ছবির শেষাংশে সার্কাসের সকল আয়োজন শেষ হলে, বিনোদনের লেনদেন ফুরালে, ধীরে ধীরে নিভে আসে তাবুর নিচের আলো, শোনা যায় করুণ ট্রাম্পেটের সুর। দুজন ক্লাউন সেই সুর তুলছে খালি চেয়ারের সারিতে। এরপর তারা ধীর পায়ে নেমে আসে মাঝের ফাঁকা মঞ্চে, সুর ছড়াতে ছড়াতে তারা গ্রিনরুমের দিকে হেঁটে যেতে থাকে, তারপর অদৃশ্য হয়ে যায় তারা, এটাই অদৃষ্ট, সব কোলাহল শেষ হলে পরে লাল-সাদা-কালো রঙের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিষাদের সুর কেউ শোনে না, তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশার খোঁজ কেউ নেয় না, সেটা অ-দৃষ্টই থেকে যায়। গোটা দুনিয়াটাই যেন এক সার্কাস, আর যারা লোকেদের মন জাগিয়ে রাখে তারাই কান্না লুকিয়ে রাখা ক্লাউন। এই এক চরিত্র, যাদের সত্যিকার অর্থেই ভালোবেসেছেন ফেলিনি। তাই এরাও তাঁর ছবিতে হয়ে ওঠে এক অনন্য ব্রত।
কোন কোন পÐিত অবশ্য এই ‘দ্য ক্লাউনস’কে ব্যর্থ ছবি বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র বিদ্যার অধ্যাপক ফ্র্যাঙ্ক বার্ক। তিনি বলছেন, ক্লাউন ও রোম নিয়ে যে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের চেষ্টা করেছেন ফেলিনি তা ব্যর্থ হয়েছে, যেমন ‘সাড়ে আট’ ছবিতে ব্যর্থ হয়েছিল গুইডো। একজন পরিচালক কি সকলের কাছে সকল কাজের জন্য সফল হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন? সাবজেক্টিভ কারণেই সেটা সম্ভব নয়। এধরনের আরো অনেক সমালোচনাই সহ্য করতে হয়েছে ফেলিনিকে। সেসব সমালোচনার মুখে ফেলিনির জবাব, “যদি বলি সাফল্য নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই, তা হলে মিথ্যা বলা হবে। ব্যর্থতা খানিক নিঃসঙ্গতার অনুভূতি নিয়ে আসে, তাকে আর যা-ই বলা যাক, অন্তত আনন্দের বলা চলে না। তবু, আমি যা করেছি তা যদি লোকের ভালো না-লাগে, তা হলে আমার কিছু করার নেই।”
তবে এটুকু না বললেই নয়, ফেলিনি সার্কাস, সিনেমা ও জীবনকে সমান্তরালে দেখতেন। ফেলিনি উবাচ, “সিনেমা অনেকটা সার্কাসের মতো। সিনেমার যদি কোন অস্তিত্ব না-থাকত, রসেলিনির [রবের্তো রসেলিনি চলচ্চিত্র পরিচালক ও ফেলিনির গুরু] সঙ্গে যদি আমার দেখা না-হত, আর যদি সার্কাসের আজও একটা সমকালীন কার্যকারীতা থাকত, আমি তা হলে একটা বড় সার্কাসের পরিচালক হতে পারলে বেশি খুশি হতাম। কারণ সার্কাসও সেই একই প্রয়োগকৌশল, সূক্ষ্ম যাথার্থ্য আর তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনের সংমিশ্রণ। অনেক মহড়া-দেওয়া, বহু বার পুনরাবৃত্ত প্রদর্শনীর মধ্যেও সার্কাসে ঝুঁকি নেওয়া হয়, অর্থাৎ সেখানেও জীবন বহমান।”
ফেলিনির মতো বড় মাপের অতর পরিচালকের বেড়ে ওঠা: সার্কাস ও ব্যঙ্গ পত্রিকায় কাজ, ফ্যাসিবাদী জমানায় ক্যারিকেচার আঁকা এবং এরপর চলচ্চিত্র জগতে আসা, এই রেখচিত্রটি মনে রাখলে চলচ্চিত্রে তাঁর বক্তব্য শুধুমাত্র সাফল্য আর ব্যর্থতা দিয়ে বিচার করা চলে না। ‘দ্য ক্লাউনস’ ছবিতে তিনি চেয়েছেন সার্কাস ও ক্লাউনদের সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি ও কল্পনার জগতকে মিলিয়ে দিতে সমকালীন বাস্তবতার সাথে, জীবনের সাথে। আর এটা বলাও বাহুল্য নয় যে ‘দ্য ক্লাউনস’ নির্মানের সময় টেলিভিশন প্রডাকশনের কথাও মাথায় রাখতে হয়েছিল তাঁকে। কারণ ইতালির টিভি চ্যানেল আরএআইয়ের সাথে চুক্তিই হয়েছিল ফেলিনির, ছবিটি সিনেমা হিসেবে যেমন মুক্তি পাবে, তেমনি টিভির অনুষ্ঠান হিসেবেও প্রচার করা হবে। টিভিতে এটি দেখানো হয় ১৯৭০ সালের ২৫ ডিসেম্বর, অর্থাৎ বড়দিনের দিন, আর সিনেমা হলে মুক্তি দেয়া হয় পরেরদিন। কাজেই এই ছবির আধার শুধু নয়, আধেয় কেমন হবে, সেটা ভেবেই কাজটি করতে হয়েছিল ফেলিনিকে।
চলচ্চিত্রে ক্লাউনদের প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র আনার পাশাপাশি যৌনকর্মী, সেনাকর্মকর্তা, ধর্মীয় গুরু এদেরকেও বারবার ফেলিনি এনেছেন। এরা ফেলিনির স্মৃতি থেকে উঠে আসা চরিত্র। আর বাকি চরিত্রের অনেকে টুকরো টুকরো ফেলিনি। কোন চরিত্র আবার বাস্তব থেকে কুড়িয়ে পাওয়া বারো আনা, বাকি চার আনা তিনি কল্পনা মিশিয়ে পেশ করেছেন রূপালী পর্দায়। তাই বলা যায়, চলচ্চিত্রে অসংখ্য বিচিত্র চরিত্রগুলো যেন ফেলিনিরই জীবন থেকেই উঠে আসা কারও না কারো সিনেম্যাটিক মেটামরফোসিস। প্রতিটি ছবিতে এতো এতো চরিত্র, ছোট-মাঝারি-বড়, নিয়ে কাজ করা যে কোন পরিচালকের জন্যই কঠিন ব্যাপার, কিন্তু কাজটি তিনি বেশ অনায়াসেই করে গেছেন আজীবন। চিত্রনাট্যের অধিকাংশই কাগজে নয়, থাকতো তাঁর উর্বর মস্তিষ্কে। আর সংলাপ? সেটা কখনো হতো তাৎক্ষণিক, আবার কখনো বা তিনি শিল্পীদের ক্যামেরার সামনে বলতেন প্রার্থনা করতে, নামতা আওড়াতে বা কোন ছড়া বলতে। ডাবিং করার সময় শিল্পীর ঠোঁটে তিনি বসিয়ে দিতেন যুৎসই সংলাপ। এমন ধারার কাজ ফেলিনির পক্ষেই করা সম্ভব, যার অসম্ভব দখল রয়েছে মাধ্যমটির উপর।
বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার জন্য নয়, সার্কাসের ক্লাউনরা যেমন তিনটি বল নিয়ে দুই হাত বদলের খেলা খেলেন, সেভাবে তিনিও নানা পরিপ্রেক্ষিতে জাগলিং করতে জানতেন চলচ্চিত্রের চরিত্রদের নিয়ে, আর এ কারণেই তিনি অনেক বড় বড় পরিচালকের শ্রদ্ধা আদায় করে নিয়েছেন। যেমন ফেলিনিকে নিয়ে নির্মিত উল্লিখিত প্রামাণ্যচিত্রে হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক উডি অ্যালেন বলছেন, প্রথমে যখন তিনি ফেলিনির ছবি দেখেছেন, তখন অতোটা তারিফ করতে পারেননি। কিন্তু যখন তিনি পরিপক্ক হতে থাকলেন এবং চলচ্চিত্র মাধ্যমটি সম্পর্কে বুঝতে শুরু করলেন, তখন বুঝলেন, ফেলিনি জিনিয়াস।
প্রতিভাবান পরিচালকরা শ্রদ্ধা করেন বলে নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্বতন্ত্র ধরনের ছবি করেছেন বলে নয়, এমনকি ফেলিনির চরিত্ররা বৈচিত্রময় বলেও নয়, একজন সংবেদনশীল ও প্রতিভাবান শিল্পীর প্রকাশভঙ্গি কতোটা উৎকেন্দ্রিক হতে পারে, সেটা বোঝার জন্য হলেও ফেলিনিকে পাঠ করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফেলিনির কথা দিয়েই তাহলে সমাপ্তি টানি, তিনি বলছেন, “শিল্পী হিসেবে আমি কোন ‘ব্যধির নিবারণ’ করতে পারি না, আমার ছবি কোন সমাধান বা কর্মপদ্ধতির ইঙ্গিত দেয় না, এমনকি কোন মতাদর্শের কথাও তারা বলে না। আমার নিজের ক্ষেত্রে কি ঘটছে না-ঘটছে, বড়জোর আমি তার প্রত্যক্ষদর্শী। আমার চারপাশের বাস্তবতাকে আমি ব্যাখ্যা আর প্রকাশ করতে পারি মাত্র— ব্যাস, তার বেশি কিছু নয়।”
সহায়
১. সন্দীপন ভট্টাচার্য সম্পাদিত, ফেদেরিকো ফেলিনি: একটি ছবির জন্ম ও অন্যান্য: নির্বাচিত রচনা বক্তৃতা সাক্ষাৎকার, ভাষান্তর: সন্দীপন ভট্টাচার্য ও দেবাশিস হালদার, (কলকাতা: মনফকিরা, ২০১৬)।
২. ফ্র্যাঙ্ক বার্ক, ফেদেরিকো ফেলিনি: রিয়েলিজম/ রেপ্রিজেন্টেশন/ সিগনিফিক্যাশন, ফেদেরিকো ফেলিনি: কনটেম্পোরারি পার্সপেক্টিভ, ফ্র্যাঙ্ক বার্ক ও মার্গারিট আর. ওয়ালার সম্পাদিত, (টরোন্টো: ইউনিভার্সিটি অব টরোন্টো প্রেস, ২০০২)।
৩. ম্যানুয়েলা জ্যেরি, কনটেম্পোরারি ইটালিয়ান ফিল্মমেকিং: স্ট্র্যাটেজিস অব সাবভারশন: পিরানদেলো, ফেলিনি, স্কোলা, অ্যান্ড দ্য ডিরেক্টর্স অব দ্য নিউ জেনারেশন, (টরোন্টো: ইউনিভার্সিটি অব টরোন্টো প্রেস, ১৯৯৫)।