আলমগীর কবির: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রকার

বিধান রিবেরু প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২২, ১১:১০ এএম আলমগীর কবির: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রকার

চলচ্চিত্র পরিচালক ও মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর কবিরকে নিয়ে এই লেখাটি লিখেছিলেন নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক পত্রিকা ‘ফিল্ম কোয়ার্টারলি’র ভ্রাম্যমান সংবাদদাতা লাইল পিয়ারসন। এটি আলমগীর কবির সম্পাদিত ইংরেজি পত্রিকা ‘সিকোয়েন্সে’র ১৯৭৭ সালের শীতকালীন তৃতীয় বালাম, প্রথম সংখ্যায়  প্রকাশ হয়। এতে দেখা যায় পত্রিকার শিল্প সম্পাদক ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী এবং লন্ডন প্রতিনিধি ছিলেন শফিক রেহমান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াতের কাছ থেকে ‘সিনেমা দর্শন’ পত্রিকার জন্য লেখাটি সংগ্রহ করা হয়। ইংরেজি থেকে বাংলায় রচনাটি অনুবাদ করেন মুহাম্মদ আহসান হাবীব ও বিধান রিবেরু।


আলমগীর কবিরের ‘বাংলাদেশ সিনেমা’ বইটি বিস্ময়করভাবে যে উচ্চতায় পৌঁছেছে তা সচরাচর সিনেমার ইতিহাসগ্রন্থেও বেলায় ঘটে না; লেখক তো নিজেই বর্তমানে দেশসেরা চলচ্চিত্রকার, আর সেটা তার হওয়ারও কথা। এতে কবিরের অবস্থান এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে নিজের ছবির সমালোচনা নিজেকেই করতে হচ্ছে। এই অবস্থানটা তেমন আকাঙ্ক্ষিত নয়। মৌসুমী সমালোচক হিসেবে আমার সুবিধা হলো:  এই লেখা ছাপা হওয়ার পর বাংলাদেশে কবিরের অনুরাগী ও নিন্দুকদের ছোড়া গোলার তাপ আমার গায়ে লাগার সুযোগ পাবে না, তার আগেই আমি চলে যাব। তদুপরি, কবির একের পর এক নিজের ছবিরই সমালোচনা করে চলবেন, তেমনটা আশা করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তারই আভাস কবির দিয়ে রেখেছেন তাঁর পূর্ববর্তী ‘দি সিনেমা ইন পাকিস্তান’ (সন্ধানী পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ১৯৬৯) বইতে, সেখানে তিনি লিখেছেন, নির্মাতার কাজ নির্মাণ আর সমালোচকের কাজ একই সাথে নির্মাণ ও বিশ্লেষণ। কবিরের কাছে ক্রমাগত নিজের ছবির সমালোচনা করে যাওয়ার দাবি তাঁর সৃষ্টিশীলতার ক্ষতিসাধন করতে পারে; যদি এমনও হয় যে, তিনি সিনেমার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ সফলভাবে নিজের মাঝে ওই দুটি কাজের সম্মিলন ঘটাতে পারলেন, সেক্ষেত্রে তিনি হয়তো কোনো চলচ্চিত্র সমালোচককে নিয়েই কেবল ভালো ছবি করতে পারবেন,  কিন্তু চলচ্চিত্র সমালোচক কি তেমন আকর্ষণীয় কোনো চরিত্র?

কবিরের প্রথমদিককার তিনটি চলচ্চিত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তোলা। তিনটিই প্রামাণ্যচিত্র, একেকটা ২০ মিনিট দৈর্ঘ্যরে। স্বাধীনতা যুদ্ধের নানা পরিস্থিতি থেকে এসব চলচ্চিত্র উঠে এসেছে। তার এসব চলচ্চিত্রে কবির শুরুতেই একেবারে যুদ্ধের ময়দানে চলে যান। তিনি তো ভালো করেই জানেন গেরিলা চলচ্চিত্র কি জিনিস। এই সিরিজের দ্বিতীয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি হলো ‘স্টপ জেনোসাইড’। এটি জহির রায়হানের সাথে মিলে অথবা তারা দুজন একটা দলে সামিল হয়ে যুদ্ধের মধ্যেই সম্পন্ন করেন। তিনটি চলচ্চিত্রেই স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রামাণ্য ছবি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘স্টপ জেনোসাইডে’ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ফিলিস্তিনসহ আরো অনেক যুদ্ধের ছবির সাথে মুক্তিযুদ্ধের ছবি জুড়ে দিয়ে চলমান মুক্তিসংগ্রামকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করা হয়েছে। ‘স্টপ জেনোসাইডে’ প্রামাণ্য ছবির ব্যবহারে যতটা সৃজনশীলতা দেখা যায়, ‘লিবারেশন ফাইটার্সে’ ততোটা দেখা যায় না। রায়হান তাঁর চলচ্চিত্রগুলোতে একজন কবি-চিত্রনির্মাতা যেমনটা করেন ঠিক সেভাবে দৃশ্যের স্থিতিস্থাপকতার মাধ্যমে বাস্তবতার ঝলক দেখিয়েছেন। তাই এতে কখনো কখনো মেলোড্রামার দোষ পাওয়া যাবে; তবে ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্য ছবি দিয়ে এমনভাবে সাজানো যাতে একটি মূল ব্রতই ফুটে ওঠে, তা হলো: স্টপ! (টেলিগ্রামে যেমন থাকে) জেনোসাইড। প্রামাণ্য ছবির বিশ্বাসযোগ্যতা বিনষ্ট না করে যতদূর পর্যন্ত সেটার সৃজনশীল ব্যবহার করা যায়, এই চলচ্চিত্রে তাই করা হয়েছে; প্রামাণ্য ছবি আরও সৃজনশীল উপায়ে ব্যবহার করা যেতে পাওে, তবে তখন সেটা দর্শকের কাছে অতীতের কোনো বিশেষ ঘটনার সাক্ষ্য হিসাবে আর প্রতিভাত হবে না। সৃজনশীলতার দিক থেকে ‘স্টপ জেনোসাইড’ খুব বেশি দূরে চলে গেছে, কি যায়নি তা হয়তো প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার। কবির নিজে এই চলচ্চিত্রের ধারাভাষ্য রচনা করেছেন এবং তাতে কণ্ঠ দিয়েছেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই ঢাকার মিরপুর থেকে রায়হানের অন্তর্ধান ঘটে। আর কখনো তাঁর খোঁজ মেলেনি।

রায়হানের মতো মাঝেমধ্যেও কবির কখনো আর্ট ন্যুভো শৈলীর প্রয়োগ ঘটাননি ছবিতে, তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’তেও (কোয়ায়েট ফ্লোজ দ্য মেঘনা অথবা মেঘনা, মেঘনা) যুদ্ধের প্রামাণ্য ছবিকে তিনি গতানুগতিক রীতিতে ব্যবহার করেছেন। নিজে পরিচালনা করলেও, ছবির চিত্রনাট্য তিনি লিখেছিলেন রায়হান পরিচালনা করবেন বলে। কবিরের চলচ্চিত্রে প্রামাণ্য ছবি ব্যবহার করা হয়েছে অসম্পাদিত 'রাশ' হিসেবে; সত্য ঘটনাবলীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে ফ্ল্যাশব্যাকে, কল্পিত চরিত্রাবলীর মাধ্যমে। ফলে, এটা এমন এক চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে, সিনেমার ভেতর প্রামাণ্য ছবিকে সর্বোচ্চ শৈল্পিক উপায়ে ব্যবহারের কারণে, সিগফ্রিড ক্র্যাকুয়ারও চলচ্চিত্রটিকে পছন্দ করতেন। ক্র্যাকুয়ারের কাছে যদি ছবিটি থাকতো তাহলে ‘ ‘ধীরে বহে মেঘনা’কে তিনি ইতালির নয়া বাস্তববাদী ধারার সাথেই মিলিয়ে দেখতেন, কয়েকটি পর্বে ভাগ করা, যেন ঢাকা রোসেলিনির ‘ওপেন সিটি’তে পরিণত হয়েছে। ‘ধীরে বহে মেঘনা’য় কতগুলো চমৎকার মুহূর্তের দেখা মেলে, যুদ্ধের বাস্তবতা ও তার পরিণতি ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেখানে।

তবে পর্বে বিভক্ত সকল চলচ্চিত্র ও একইভাবে প্রায় সকল নয়া বাস্তববাদী ছবির মতোই এখানেও কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে, যা ‘স্টপ জেনোসাইডে’র ঠিক উল্টো: কাল্পনিক চরিত্রদের নিয়ে ছবি তুললে সবসময় গল্পকে বাড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ‘স্টপ জেনোসাইডে’ কাব্যিক কাঠামোর ভেতর প্রামাণ্য ছবিকে ব্যবহারের প্রয়াস ছিল। আর এখানে পরিবারের মাধ্যমে কিছু কল্পিত চরিত্রকে একটি প্রামাণ্যচিত্রের অবয়বের ভেতর জায়গা করে দেয়ার প্রচেষ্টা রয়েছে। এর পাশাপাশি ছবিতে প্রামাণ্যচিত্রের অবয়ব  থেকে বেরিয়ে সাধারণ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের নিরাপদ ছকে যাওয়ার আকাক্সক্ষাও লক্ষ্য করা যায়। ২০ মিনিটের একটি দৃশ্য এই চলচ্চিত্রের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা দুটিকেই ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম।

দিল্লিতে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনারত ভারতীয় নারী অনিতা (ববিতা) স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে আসেন; তাকে এক নবীন সাংবাদিক (আজমল হুদা) যুদ্ধের সময়কার ভয়ানক নৃশংসতা, যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে বুদ্ধিজীবী-হত্যার উপর কিছু দালিলিক ছবি দেখান। অনিতার কাছে তারা নৃশংসভাবে খুন হওয়া কতগুলো মানুষ মাত্র; তবে এসব ছবি থেকে আমরা যতটুকু জানতে পারি, গভীর সত্যটা তার থেকেও আরো অনেক ভয়ংকর- বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ঠিক আগে শত্রুপক্ষ পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে এমনসব মানুষদের, যারা ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের সেরা বুদ্ধিজীবী, আর তাদের এভাবে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল যাতে স্বাধীন হয়ে দেশটি আধা-সামন্ততান্ত্রিক ও আদিম রাষ্ট্রই থেকে যায়। এসব ছবি শক্তিশালী, তবে যেভাবে এগুলো ব্যবহৃত হয়েছে যা অনিতার মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি এমন ভালোবাসা জাগিয়ে তুলেছে যা সে আগে কখনো অনুভব করেনি, সেই ব্যবহারের থেকে এদের পেছনের সত্যটা আরো অনেক শক্তিশালী। কারণ তার প্রেমিক প্রদীপ এই যুদ্ধের সময়ই সম্মুখ সমরে মারা গিয়েছিল। এখানে প্রামাণ্যচিত্রকে বিসর্জন দেয়া হয়েছে কল্পনামিশ্রিত প্রামাণ্যছবির কাছে, যদিও কবির নিজে যেসব প্রামাণ্য ছবি তুলেছিলেন সেসব বিশুদ্ধ দৃশ্যের শক্তি হারিয়ে যায়নি, এতে অনিতার দোলাচল আরো তীব্র আকারেই প্রকাশ হয়েছে।

অনিতা পর্দায় যা দেখেছিল, তা তাকে এতোটাই ক্ষুব্ধ করে তোলে যে রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। তাই ঘুমের বড়ি খায় সে। বড়িতে কাজ হয়Ñ হঠাৎ আমরা চলে যাই স্বপ্নের জগতে, অতীতে। এখানে দেখা যায়, কবির এতক্ষণ যে পর্বানুযায়ী গল্প বলে যাচ্ছিলেন তা ভেঙে ফেলেন, আমরা তখন দেখি আর দশটা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মতোই হয়ে উঠেছে ছবিটি। সাংবাদিকের দেখানো ভয়াবহ নৃশংস ছবি দেখার পর, আমাদের উপর যেন কিছুটা আফিম প্রয়োগ করে নিয়ে যাওয়া হয় দূর অতীতে । এক সমালোচক মিশরীয় সিনেমাকে “নকল আফিম সিনেমা”, অর্থাৎ হলিউডি সিনেমার অনুকরণ বলে অভিযোগ তুলেছিলেন। ‘ধীরে বহে মেঘনা’র আলোচ্য দৃশ্যটি আফিম সিনেমার যে গুটিকয়েক উদাহরণ আমি জানি, তার একটি প্রকৃত উদাহরণ হয়েছে।

সত্যিকারের আফিমের আছর দর্শকের উপর ততোটা পড়ে না, যতোটা অনুকরণের আফিম খেলে পড়ে, উদাহরণ হিসেবে বলা যায় হলিউডের অনুকরণের কথা। ‘ধীরে বহে মেঘনা’ও দর্শকের উপর আছর ফেলতে পারেনি। ছবিটি ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি। কবিরের দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সূর্যকন্যা (ডটার অব দ্য সান) শেষ হতে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তবে মাঝখানের কয়েক বছর যে ইচ্ছে করে আলস্যে কেটেছে তা কিন্তু নয়, বরং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করার মধ্য দিয়ে গেছে। ‘ধীরে বহে মেঘনা’ নয়া বাস্তববাদী ধাঁচের, তুলনায় ‘সূর্যকন্যা’ একটু চটকদার, কলকাতার ভালো সিনেমার মতো, অথবা কলকাতায় যেমন চলচ্চিত্র নির্মিত হওয়া উচিত সেরকম (এই ছবির কিছু অংশ আর ‘ধীরে বহে মেঘনার’ও অংশবিশেষ কলকাতায় নির্মিত)। এই চলচ্চিত্রে জোর করে সরলতা আরোপের কসরত নাই, নিষ্প্রভ নয়, বরং জীবনের তীব্রতা, উদ্দাম, প্রাণময় উদযাপন রয়েছে। একইসাথে এই চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’র চেয়ে অধিকতর বিশ্লেষণধর্মী ও ব্যঙ্গাত্মক। এই ছবিতে দুই বন্ধু লেনিন ও রাসেল, প্রথমজন গরিব আর পরেরজন ধনী, তাদের দুটি সমান্তরাল প্রেম দেখানো হয় এই ছবিতে, প্রথমটা কল্পিত আর পরেরটা প্রয়োগিক। ‘সূর্যকন্যা’য় যৌথ পরিবারকে টেনে আনা হয়েছে কেবল প্লট এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনে। চিত্রশিল্পী লেনিনের চাকরি পাওয়া জরুরি, কারণ তাতে তার বাবা খুশি হবেন, অবশ্য তার মা এসবের ধার ধারেন না। এরপর যৌথ পরিবারের প্রসঙ্গ আর ওঠেনি বললেই চলে। এখানে সাজানো পরিবেশ আর শুধু ধূসর পশ্চাৎপট (ব্যাকগ্রাউন্ড) হয়ে রয় না, বরং ছবিটির কাঠামোগত উপাদান হয়ে ওঠে—উদাহরণস্বরূপ, লেনিনের বাড়ির বারান্দা দুটি খিলানে ভাগ করা, যার নিচে এসে দাঁড়ায় কোনো খলচরিত্র, অনেকটা যেন সুইস কোকিল ঘড়ির ভেতর থাকা চরিত্রের মতো। এক জাদুঘরে গিয়ে লেনিন ডুবে যায় হিন্দু রাজত্বের ইয়ুঙ্গিয় কল্পজগতে। তার কল্পিত প্রেমিকা মূর্তি থেকে জীবন্ত হয়ে উঠা এক নারী, তার কপালে তৃতীয় নয়নরূপে আঁকা মিশরীয় কোবরা যা সমস্ত নারীকূলের প্রতিভূ, সেই সূর্যের কন্যা বেশিরভাগ নারীর আরাধ্য, গর্ভধারণ থেকে মুক্তি চায় সে: সে এক বিশ্বজনীন নারী যে আশা করে আছে কোনো এক ভোরে একজন খাঁটি প্রেমিক তাকে মুক্ত করবে, তার প্রেম হবে এমনই যে তাতে তার কাছে কোনো দাবি থাকবে না।

ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বিত্তশালী বন্ধু রাসেলের বদৌলতে তার দোকানে লেনিনের চাকরি হয়; সেই দোকানের এক নারী বিক্রয়কর্মীকে দেখা যায় ‘ভ্যালি অফ দ্য ডলস’ পড়ছেনÑ পুরো ছবির মধ্যে এখানেই সম্ভবত আফিমের সবচেয়ে নিকটতম যোগসূত্র মেলে। পুরো দৃশ্যে ঘড়ির টিকটক শব্দ বিষয়বস্তুর প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে (এই বিষয়টা আরো স্পষ্ট হয় যখন ভোর চারটায় মূর্তিটি মুক্তি চায়)। যখন কল্পনায় রাতের বেলা ইন্টারকন্টিনেন্টালের সুইমিং পুলের পাশে জীবন্ত মূর্তিটি লেনিনকে নারীমুক্তির সঙ্গীত শোনাচ্ছিল, তখন বাস্তবে রাসেল তার দোকানের নারী বিক্রয়কর্মীকে (জয়শ্রী কবির) শয্যায় নিয়ে যাচ্ছিল। সেই সময় টেপে বাজতে শুনি মিকিস থিওডোরাকিসের (Mikis Theodorakis) [জেড (১৯৬৯) চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালক, যিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রিসে কিছু সময়ের জন্য বন্দী ছিলেন] সঙ্গীত, আর রাসেল তখন শেক্সপিয়ারের রিচার্ড দ্য থার্ডের অনুকরণ করছিল। সেন্সরের কর্তনের কারণে দুটি ভালো মুহুর্ত নষ্ট হয়েছে—একটিতে জয়শ্রী সিগারেট টানছেন আর অন্যটিতে টয়লেট ফ্লাশের শব্দ, তবে একটি ব্যাঙ্গাত্মক ক্লাসিক মুহূর্ত রয়ে গেছে: মিলনের পর রাসেল বিছানায় শুয়ে শয্যাসঙ্গীর চুলের কাঁটায় হাত বুলাচ্ছে, সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসারে’ ঠিক অপুর মতো করে, পার্থক্য এই রাসেলের পাশে পড়েছিল একটি ব্যবহৃত কনডমের খোসা।

উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রে সচরাচর যেসব প্রতীক সহজলভ্য সেগুলো এই ছবিতেও দেখা যায়, তবে এখানে স্বরভঙ্গিটা ব্যঙ্গাত্মক আর উদ্দেশ্য আনন্দ দান, মুখে তুলে গিলিয়ে দেওয়া নয়। রাসেল শেষ বিচারে হয়তো বাস্তবধর্মপ্রয়োগবাদী, তবে কবির যে কায়দা ব্যবহার করেছেন তা হলো বাইরে থেকে লোকটির নিন্দা করার চাইতে  বরং তার বোকামির ভেতরে প্রবেশ করা। ছবিটার শেষভাগে যখন লেনিন তার স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠে, তখন সে দেখে তার কল্পনার মেয়েটি তার সামনে জীবন্ত দাঁড়িয়ে, হাস্যোজ্জ্বল মুখাবয়বে আর তাকে বিয়ে করতে প্রস্তুত, প্রায় তখন অবধি ব্যঙ্গাত্মক স্বরভঙ্গিটা বজায় ছিল—অথচ উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে এমন ব্যঙ্গাত্মক স্বর পাওয়া প্রায় অচিন্তনীয়। একেবারে শেষে, কল্পনাকে কি বাস্তবের ছাঁচে ঢুকিয়ে দেয়া হলো, নাকি এটাও লেনিনের আরেকটি স্বপ্ন মাত্র? যদি স্বপ্নকে (আফিম) বাস্তবতার সাথে তুলনা করে বাতিল করা হয়, তাহলে তা কেবল বাণিজ্যিক শিল্প হিসাবেই সার্থক হতে পারে, অন্য কোনো রূপে নয়। তথাপি এই ছবিতে যেভাবে স্বাভাবিক ছন্দে সূক্ষ্ম ও সরস চিত্র আঁকা হয়েছে, তাতে গোটা ছবি নিয়ে আক্ষেপ করার জায়গা কম— ছবিটি দেখে মনে হয় কবীরের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা বিশ্বাসযোগ্য বিনোদনের পশ্চাৎপটে ব্যবহৃত হয়েছে।

অনেক পরিচালকই নিজেদের দ্বিতীয় চলচ্চিত্রে নিছকভাবে জোরেশোরে প্রথমটির শক্তি ও দুর্বলতার প্রকাশ ঘটায়— তবে কবিরের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র শক্তি ও দুর্বলতা দুটিকেই ছাপিয়ে গিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের কাছাকাছি কিছুটা অভিঘাত তৈরি করেছে।

 

কবিরের ‘সীমানা পেরিয়ে’ (বিয়ন্ড দ্য ফ্রিঞ্জ) তৃতীয় ছবিতে হয়তো কিছুটা গলদ ছিল। এই ছবিতে শ্রেণী সংগ্রামের খুব সহজ সমাধান দিতে গিয়ে বিসর্জন দেয়া হয়েছে নারীমুক্তিকে। এক ব্যারিস্টারের মেয়ে নিম্নবিত্ত এক মাঝির সাথে একটা নির্জন দ্বীপে কিছুদিন আটকে থাকার পর তার পিতাকে তাদের গান্ধর্ব বিয়ে মেনে নিতে রাজি করায়। দ্রুত ঘনিয়ে ওঠা সুখ ও কল্পনাপর্ব (ভ্যালি অব দ্য ডলস ঘুমের ওষুধ বিষয়ক উপন্যাস) প্রতিস্থাপিত হয় অভাব দিয়েÑ জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়ির অভাব। পিতাকে ব্যাপারটি মেনে নিতেই হয়, দর্শকদেরও মানতে হয়, কারণ গান্ধর্ব মতে বিবাহিত স্বামীর দ্বারা মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়েছে।

‘সূর্যকন্যা’য় ক্যামেরা ও স্থাপত্যের মধ্যকার খেলা যেমন নানা ব্যঙ্গাত্মক দিককে ফুটিয়ে তুলেছে, তার বিপরীতে মূলত নির্জন দ্বীপে চিত্রায়িত হওয়ায় এই ছবিতে সেটি অনুপস্থিত। তবে ভেতরের (ইন্টেরিয়র) যে গুটিকয়েক শট রয়েছে, সেগুলো খুব ভালোভাবে নেওয়া, বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে রাতের ঢাকায় চলন্ত গাড়ির সামনের সিটের একটি দৃশ্যের কথা এবং ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বাড়ির সামনের আরেকটি দৃশ্যের কথা। কিন্তু নির্জন দ্বীপটি ‘পোস্টকার্ড ব্যাকড্রপ’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

এই ছবিতে বাস্তববোধের খুব একটা দেখা মেলে না; বাস্তবজীবনের ক্ষয়িষ্ণু কোনো জমিদারও আসলে এই অতিসুন্দর চরিত্রগুলোর সঙ্গে পেরে উঠবে না, মানে এক মাসের ভোগ্যপণ্য ও মোমের আলোয় বনভোজনের যে আয়োজন আমরা দেখি নির্জন দ্বীপে ভেসে যাওয়া দুই মূল চরিত্রের মাধ্যমে। জয়শ্রী কবিরের টিনা চরিত্রটি ‘সূর্যকন্যা’র চরিত্রের চেয়ে অনেক আকর্ষণীয়, তবে কালু চরিত্র যতটুকু অশিষ্ট হওয়ার কথা ছিলো, বুলবুল আহমেদে তা ছিলো না; তিনি যখন তখন থুতু ফেলেন না, নোংরা কাপড়চোপড়ও পরেন না। স্বর্গোদ্যানের শেষ দম্পতির সর্বজনীন মূলভাবকে কবির যেভাবে দেখিয়েছেন, তা ভের্তম্যুলারের (Lina Wertmüller, ইতালিয় চিত্রপরিচালক)  “সুয়েপ্ট অ্যাওয়ে” (১৯৭৪) থেকে একেবারেই আলাদা।

‘সীমানা পেরিয়ে’ ছবিতে যে সামান্য প্রামাণ্য ছবি ব্যবহৃত হয়েছে— ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসলীলার অল্প কিছু ছবি, যা ছবির কাহিনিকে অনুপ্রাণিত করেছে— নীলাভা দেয়া, আর একটা গানের ভেতর সবকিছু ঢোকানো। তবে জনপ্রিয় গানের সাথে মেঘনা নদীতে ভাসমান ফুলে উঠা নীল গরু বরং কবিরের কূটাভাসের চেয়ে  ঘূর্ণিঝড়কেই বেশি ফুটিয়ে তোলে: জটিল কিছু করতে গিয়ে আসলে তিনি শিল্পকেই বিসর্জন দিয়েছেন। এই ছবির জন্য তিনি কঠোর শ্রম দিয়েছেন— সহজে কাজ সারার পথে না গিয়ে তিনি নির্জন দ্বীপে আট জন কলাকুশলী ও ফুজি কালার স্টক নিয়ে এক মাস থেকেছেন। এতে চালচ্চৈত্রিক কলাকৌশল উচ্চতায় পৌঁছেছে, তবে কবির এতে করে নিজের আবেগ ও রসবোধকে জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে। এমনকি কিছু ছোট চরিত্রে অভিনয়ের কলাকৌশলের অতিব্যবহার হতে দেখা গেছে: খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটা এক রাজনৈতিক নেতার ভূমিকায় গোলাম মোস্তফা যেভাবে মাছ ধরার জাল পরিবেষ্টিত জায়গায় জোর কদমে হাঁটছিলেন, তাতে কলোকৌশলগত দিক থেকে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও, সেই অভিনয় ছিলো আমার দেখা তাঁর সবচেয়ে অসন্তোষযোগ্য কাজ।

বাংলাদেশে চিত্রিত সপ্তম পূর্ণদৈর্ঘ্য রঙিন ছবি ‘সীমানা পেরিয়ে’ বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ—এটিই নিশ্চিতভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিত্রিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য রঙিন ছবি। তবে ‘সীমানা পেরিয়ে’তে  যেসব সমস্যা রয়ে গেছে, তা আলমগীর কবিরের ক্যারিয়ার দমিয়ে দেওয়ার মতো নয়—তিনি ভাবনাচিন্তায় পরিপূর্ণ একজন মানুষ, আর তিনি পরবর্তীকালে কোনটা বানাবেন তা কেউ বলতে পারে না, এমনও হতে পারে যে হয়তো হ্যামলেট বানাতে লেগে পড়লেন। স্পষ্টতই তিনি বাংলাদেশের সাধারণ বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে চলে এসেছেন। যেখানে বাংলাদেশে দেদারসে হিন্দি ছবির নকল করে ছবি তৈরি হচ্ছে, সেখানে তখন কবির [মার্ক] ডনসকোই, রোসেলিনি, শ্লেসিংগার, রায়, থিওডোরাকিস ও শেক্সপিয়ারের পাশাপাশি জহির রায়হানের অভিজ্ঞতা থেকে নিজেকে ঝালিয়ে নিচ্ছেন। তিনি সেই ব্যতিক্রম এক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রকার, যিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন মূলত জাতীয় দর্শকের জন্য, কবিরকে তাই বলা যায় প্রথাগত সমাজের ভেতর প্রথাবহির্ভূত এক মানুষ। কবির আত্মবিক্রয় করার মতো শিল্পী নন; যদি তিনি আদর্শবাদ (আইডিয়ালিজম) ও প্রয়োগবাদের (প্র্যাগম্যাটিজম) মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখেন, তাহলে তাঁর চলচ্চিত্রের প্রতি বাংলাদেশে যেমন, বহির্বিশ্বে আন্তর্জাতিক দর্শকদেরও আগ্রহ ক্রমশ বাড়তে থাকবে। কোনো একদিকে খুব বেশি ঝুঁকে পড়লে তিনিও এক প্রতিভাধর প্রতিক্রিয়াশীলে পরিণত হবেন, ঠিক যেমনটা ঘটেছে ‘সূর্যকন্যা’র লেনিন বা লেনিনের বিপরীতে প্রতিনায়ক রাসেলের ক্ষেত্রে। তবে তাঁর ভারসাম্য বজায় থাকলে, তিনি আজকের দুনিয়ার অন্যতম সফল চলচ্চিত্রকার হয়ে উঠতে পারবেন।

প্রতীক ও বাস্তবতা দুই স্তরেই ছবিকে ক্রিয়াশীল থাকতে হয়; একইসাথে ছবিকে যেমন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক হতে হয়, ঠিক তেমনই একই সময়ে ছবিকে হতে হয় নির্দিষ্ট ও সর্বজনীন। কবির এদের কোনো একটাকেও উপেক্ষা করতে পারেন না, যদি করেন তাহলে এশীয় সিনেমার এক তরুণ স্রষ্টার কাজ হারিয়ে যাবে।